মালখানায় আলামতের পাহাড় নষ্ট হচ্ছে ৩৫ হাজার গাড়ি
আরাফাত মুন্না ও মাহবুব মমতাজী
দেশজুড়ে থানা ও আদালতের মালখানাগুলো এখন জব্দ করা আলামত ও সম্পত্তির ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। বিচার শেষ না হওয়া, রায়ের কপি সময়মতো না পৌঁছানো, জায়গার সংকট, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব এবং প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে বছরের পর বছর ধরে এখানে জমে আছে লাখ লাখ আলামত। খোলা আকাশের নিচে রোদবৃষ্টিতে পচে নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার এ রাষ্ট্রীয় সম্পদ। এ চরম অব্যবস্থাপনা নিরসনে সম্প্রতি এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাই কোর্ট একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে দিয়েছেন। বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তাজরুল হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে প্রধান করে গত বুধবার ১২ সদস্যের এ কমিটি গঠন করেন। কমিটিকে আগামী দুই মাসের মধ্যে মালখানা ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জব্দ আলামত দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সারা দেশের থানাগুলোর প্রতি সার্কুলার জারি করতে পুলিশ মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) এবং অধস্তন আদালতের প্রতি সার্কুলার জারি করতে রেজিস্ট্রার জেনারেলকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। পাঁচজন আইনজীবীর পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির রিটটি দায়ের করেছিলেন।
এদিকে এ পরিস্থিতি উত্তরণে পুলিশ সদরদপ্তরের তদন্ত কমিটির জরুরি সুপারিশে বলা হয়েছে, ৬৫৬টি থানার জন্য ৪৪.৭৭ লাখ বর্গফুট এবং ৯১টি আদালতের জন্য ৮.১৪ লাখ বর্গফুট জমি বরাদ্দ করে বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক মালখানা ও বহুতল ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণ করা হোক। মামলা নিষ্পত্তির সঙ্গে সঙ্গে রায়ের কপি ডিজিটাল পদ্ধতিতে দ্রুত মালখানায় পাঠানো বাধ্যতামূলক করা হোক। আদালতের অনুমতি নিয়ে প্রকৃত মালিকের কাছে দ্রুত সম্পত্তি হস্তান্তর এবং মালিকবিহীন সম্পত্তি দ্রুত নিলামের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হোক। আলামত সংরক্ষণের জন্য বাজেটে আলাদা অর্থ ও লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করা হোক। সংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চ আদালতের এ হস্তক্ষেপের পর যদি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে জব্দ করা বিপুল পরিমাণ সরকারি হেফাজতের সম্পত্তি সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়বে এবং মালখানা ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।
১৪ লাখের বেশি জব্দ সম্পত্তি, ৩৫ হাজার যানবাহন : পুলিশের একটি উচ্চপর্যায়ের অনুসন্ধান ও তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বর্তমানে দেশের থানা ও আদালতের মালখানায় ১৪ লাখ ২৪ হাজার ৭৭টি জব্দকৃত আলামত ও সম্পত্তি সংরক্ষিত আছে। এর মধ্যে আছে ৩৫ হাজার ৫৮৮টি যানবাহন ও জলযান (থানায় ২৫,৭২৩টি এবং আদালতের হেফাজতে ১৮,৮৬৫টি) এবং ১৪ লাখেরও বেশি অন্যান্য আলামত। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে থানায় ১ হাজার ৯৬৪টি এবং আদালতে ১ হাজার ৭৬৪টি যানবাহন জব্দ অবস্থায় পড়ে আছে। এ ছাড়া ৫ থেকে ১০ বছর ধরে পড়ে আছে আরও ৮ হাজার ৩৩৭টি যানবাহন। যানবাহনের বাইরে থানায় ৬ হাজার ৮২০টি এবং আদালতে ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৭০টি সাধারণ আলামত ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মালখানায় সংরক্ষিত রয়েছে। দীর্ঘ সময় পড়ে থাকায় এসব মালামাল যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-প্রমাণও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জায়গা নেই, ডাম্পিং ইয়ার্ড নেই : সারা দেশে থানার ৭৪০টি এবং আদালতের ২২৭টি মালখানার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি মালখানা ব্যবহারের অনুপযোগী বা তীব্র জায়গার সংকটে ভুগছে। মাত্র ১২২টি থেকে ৩৭২টি মালখানাকে ব্যবহার উপযোগী বলা হলেও বাকিগুলোর দশা জরাজীর্ণ। থানা মালখানার বর্তমান জায়গা যেখানে ২ লাখ ৬৬ হাজার বর্গফুট, সেখানে প্রয়োজন প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার বর্গফুট। সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দিয়েছে ডাম্পিং ইয়ার্ডে। মাত্র ৬টি থানায় শেডযুক্ত ডাম্পিং সুবিধা রয়েছে। বিপরীতে ১৮১টি থানায় কোনো শেড বা ডাম্পিং ইয়ার্ড না থাকায় থানা ভবনের সামনে, পেছনে, গেটের পাশে কিংবা চলাচলের রাস্তার ধারে খোলা আকাশের নিচে জব্দ করা যানবাহন রাখা হচ্ছে।
স্থবিরতার মূল কারণ ও রায়ের কপি জট : পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বহু মামলার বিচার শেষ হলেও সংশ্লিষ্ট আদালতের রায়ের কপি সময়মতো মালখানা কর্মকর্তার কাছে পৌঁছায় না। ফলে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আলামত ফেরত দেওয়া, নিলাম করা বা ধ্বংস করার কাজ দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে। এ ছাড়া অধিকাংশ মালখানায় প্রয়োজনীয় জনবল, আধুনিক র্যাকিং সিস্টেম, ভেন্টিলেশন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল ডেটাবেজ নেই।
ভারতের মডেল অনুসরণের পরামর্শ : রিট আবেদনকারীর আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির জানান, শুনানিতে ভারতের একটি আধুনিক মালখানা ব্যবস্থাপনার প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং নবগঠিত কমিটিকে সেই প্রতিবেদন অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, জব্দ করা মালামাল এভাবে বছর বছর পড়ে থাকার কারণে তা রাষ্ট্রেরও কাজে লাগে না, মালিকেরও কাজে লাগে না। এ মালখানা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমকে তথ্য-প্রযুক্তি সমৃদ্ধ করে যদি নতুন করে সাজানো যায়, তবে তা উপমহাদেশে একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।
