‘মিডিয়ায় মুখ খুললেই বিপদ’, কারাবন্দি ইমরান খানের জীবন নিয়ে শঙ্কায় ছেলেরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

পাকিস্তানের কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের স্বাস্থ্য ও শারীরিক অবস্থা নিয়ে চরম উদ্বেগ ও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন লন্ডনে অবস্থানরত তার দুই ছেলে কাসিম খান ও সুলাইমান ঈসা খান। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তারা অভিযোগ করেন, পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ গত সাত মাস ধরে পরিবার, আইনজীবী ও চিকিৎসকদের তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দিচ্ছে না।

ইমরান খান ও তার স্ত্রী বুশরা বিবির অবিলম্বে মুক্তি এবং তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও চিকিৎসাসেবার নিশ্চয়তার দাবিতে বুধবার পাকিস্তানজুড়ে তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)-এর হাজার হাজার কর্মী রাজপথে নেমে ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশটির নেতৃত্ব দেওয়া সাবেক এই ক্রিকেট তারকা দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ফাঁসের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে এক বছর ধরে কারাগারে রয়েছেন।

তবে ইমরান খান ও তার সমর্থকদের দাবি, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের নেতৃত্বাধীন সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও প্রতিপক্ষ দমনের অংশ হিসেবেই এই সাজানো মামলা দেওয়া হয়েছে। অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ইমরান খান সামরিক বাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্রের যোগসাজশে তাকে উৎখাতের অভিযোগে দেশজুড়ে বিশাল সমাবেশ গড়ে তুলেছিলেন, যা পরবর্তীতে সরকার কঠোরভাবে দমন করে। এ সময় দলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার এবং ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে পিটিআই-কে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বাধা দেওয়া হয়।

লন্ডনে থাকা কাসিম ও সুলাইমান জানান, মিডিয়াতে মুখ খুললেই তাদের জন্য বাবার সঙ্গে দেখা করার পথ আরও কঠিন করে দেয় ইসলামাবাদ। ভিজিট ভিসা দেওয়া বা বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করে তাদের সফর আটকে রাখা হচ্ছে।

তাদের ভিসা না পাওয়ার কারণ হিসেবে পাকিস্তানি তথ্য মন্ত্রণালয় সিএনএনকে জানায়, ইমরান খানের দুই ছেলের কাছে ওভারসিজ পাকিস্তানিদের জাতীয় পরিচয়পত্র রয়েছে, যার ফলে তাদের আলাদা ভিসার প্রয়োজন হওয়ার কথা নয় এবং তারা বিষয়টিকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে কাসিম ও সুলাইমান স্পষ্ট করেন যে, তাদের পরিচয়পত্রের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে এবং সরকার তা নবায়ন করেনি।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও এক বিবৃতিতে ইমরান খান ও বুশরা বিবির স্বজন ও আইনজীবীদের সঙ্গে দেখা করার সাংবিধানিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার এবং তাদের বেআইনি একক কারাবাস অবিলম্বে বন্ধ করে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।

এদিকে সিএনএন-এর কাছে পাঠানো এক বিবৃতিতে পাকিস্তান সরকার অভিযোগগুলো একবাক্যে নাকচ করে দিয়েছে। সরকারের দাবি, সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে কোনো ব্ল্যাকআউট বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মধ্যে রাখা হয়নি এবং তার স্বাস্থ্য সম্পূর্ণ স্থিতিশীল রয়েছে। বিবৃতিতে জানানো হয়, ২০২৬ সালের ২১ মার্চ ইমরান খান সর্বশেষ তার ছেলের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। কারাবিধি অনুযায়ী তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকার জানায়, ইমরান খানকে সাধারণ কোনো কক্ষে নয়, বরং প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন কয়েদির জন্য নির্ধারিত ৭ কক্ষবিশিষ্ট একটি বিশেষ কম্পাউন্ডে রাখা হয়েছে, যার মধ্যে একটি বড় বারান্দা, লন, বিছানা, টেবিল, চেয়ার, ব্যায়ামের সরঞ্জামসহ যাবতীয় আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান।

তবে সরকারের এসব ব্যাখ্যা মানবাধিকার সংস্থা বা ইমরান খানের পরিবারের উদ্বেগ দূর করতে পারছে না। কাসিম খান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার তার বাবার কোনো আনুষ্ঠানিক স্বাস্থ্য প্রতিবেদন প্রকাশ করতে অস্বীকার করছে, যা থেকে ধারণা করা যায় যে তার শারীরিক অবস্থার হয়তো মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। সামরিক আদালতে দলের ৮৫ জনের দণ্ডপ্রদান ও অসংখ্য নেতাকর্মীর অন্যায় গ্রেফতারের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাবা কখনোই একা রেহাই পাওয়ার জন্য সরকারের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাবেন না। দেশের ৩৫ কোটি মানুষ ইমরান খানকে তাদের নেতা হিসেবে দেখতে চায়, অথচ কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিবিদকে জোর করে আদালতের আড়ালে ও খাঁচায় বন্দি করে রাখা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights