যন্তর মন্তরে আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিষেধাজ্ঞা, ক্ষোভ ঝাড়লেন রাহুল গান্ধী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে দূরে থাকার নির্দেশনা জারি করায় দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ভারতের লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের রাজপথ বা যন্তর মন্তরের মতো জায়গায় আয়োজিত ‘বেআইনি গণজমায়েত’ থেকে দূরে থাকতে গত বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি নোটিশ জারি করে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় (ডিইউ)।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে শুক্রবার সকালে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় একটি বিবৃতি প্রদান করেন কংগ্রেসের এই শীর্ষ নেতা। নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে রাহুল গান্ধী তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লেখেন, ‌গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করার কারণে শিক্ষার্থীদের হুমকি দেওয়ার এত বড় সাহস তোমাদের কীভাবে হয়? সে সময় তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে আরও যুক্ত করেন যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে এর জবাবদিহি করতে হবে। কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি লেখেন, মনে রেখো, সময় যখন আসবে তখন তোমাকেই কিন্তু এই কাজের জন্য চূড়ান্ত জবাবদিহি করতে হবে।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক জারিকৃত নোটিশে বলা হয়েছিল, প্রিয় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকবৃন্দ, আপনাদের নিরাপত্তা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনারা দয়া করে মনে রাখবেন যে, নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে আয়োজিত যেকোনো বেআইনি জমায়েত বা বিক্ষোভ কর্মসূচি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা অনুযায়ী অত্যন্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়, ফলে এতে অংশ নিলে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হতে পারে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যেমন গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তেমনি তাদের একাডেমিক অগ্রগতি এবং ভবিষ্যতের পেশাগত সুযোগগুলোকেও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সেই অনুযায়ী, সকল শিক্ষার্থীকে যন্তর মন্তর থেকে দূরে থাকার এবং তাদের নিজের নিরাপত্তা ও আইন মেনে চলাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বর্তমান পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার উদ্দেশ্যে প্রচুর পরিমাণ ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য তৈরি ও ছড়ানো হচ্ছে, সে ব্যাপারেও আপনাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

কেবল দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে ভারতের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়া এই বিক্ষোভ থেকে নিজেদের শিক্ষার্থীদের দূরে রাখতে নির্দেশনা জারি করার তালিকায় যুক্ত হয়েছে দিল্লির ঐতিহ্যবাহী জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ও (জেএনইউ)। শুক্রবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি নোটিশ প্রকাশ করে বলা হয়, জেএনইউ-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জ্ঞানচর্চাকারী সমাজের সকল অংশকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে এবং নিজ নিজ ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ বিক্ষোভ প্রদর্শন-সংক্রান্ত বিষয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া দিকনির্দেশনা অনুযায়ী আপনাদের প্রতি অনুরোধ করা হচ্ছে, আপনারা নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে বা তার আশপাশে কোনো ধরনের সমাবেশে যাওয়া বা অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকুন। এর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বিষয়েও শিক্ষার্থীদের কড়া বার্তা দিয়েছে জেএনইউ। নোটিশে সতর্ক করে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে দয়া করে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিন। এর ব্যতিক্রম হলে প্রযোজ্য আইনের অধীনে আইনি ব্যবস্থা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আচরণবিধি অনুযায়ী শৃঙ্খলাভঙ্গের বিচার হতে পারে।

বিভিন্ন স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এসব আদেশ ও সতর্কবার্তার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন মহল থেকে তীব্র প্রতিবাদ ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নোটিশের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ভারতের বিখ্যাত অভিনেত্রী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা পূজা ভাট শিক্ষার্থীদের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টার সমালোচনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, শিক্ষার্থীদের কণ্ঠ যদি এভাবে দমন করা হয়, তবে তাদের নিরাপত্তা আরও বেশি ঝুঁকিতে পড়বে। আমরা যদি সত্যিই তাদের ভবিষ্যতের বিষয়ে আন্তরিক হই, তবে কোনো ধরনের নীরবতার ষড়যন্ত্রে শরিক না হয়ে তাদের কথা বলার অধিকারকে সমর্থন করা আমাদের দায়িত্ব।

একই সঙ্গে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বার্তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন কংগ্রেস সংসদ সদস্য তথা ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র দীপেন্দর হুডা। তিনি বলেন, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে এবং একজন আইনপ্রণেতা ও সংসদ সদস্য হিসেবে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিভ্রান্তিকর ও হুমকিমূলক বিবৃতির আমি তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। সুপ্রিম কোর্টের কোন রায়ে যন্তর মন্তরের এই আন্দোলন ও গণজমায়েতকে সরাসরি ‘বেআইনি’ বলা হয়েছে, যা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের বিবৃতিতে দাবি করেছে? নিজেদের শিক্ষার্থীদের কাছে এভাবে মিথ্যা কথা বলার জন্য দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের লজ্জা হওয়া উচিত।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলোর এই অনড় অবস্থানের ঘটনাটি কেবল দিল্লিতেই সীমাবদ্ধ নেই। এর কয়েক দিন আগেই ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি) রুরকি একইভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি কঠোর নির্দেশনা জারি করেছিল। সেখানে স্পষ্ট জানানো হয়েছিল যে, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অনুমতি ছাড়া কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন বা প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক মতামত বা মন্তব্য প্রদান করতে পারবেন না। এই ঘটনা নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হলে আইআইটি রুরকি কর্তৃপক্ষ সাফাই গেয়ে জানায় যে, এটি কোনো নতুন নিয়ম বা আকস্মিক নির্দেশনা নয়; প্রতিটি শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই নিয়মিত আচরণের অংশ হিসেবে এটি প্রচার করা হয়।

অপরদিকে, প্রযুক্তিবিদ্যা কেন্দ্র আইআইটি মাদ্রাসের বিরুদ্ধেও শিক্ষার্থীদের মুখ বন্ধ করার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থী জানান, যন্তর মন্তর আন্দোলনের সমর্থনে ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা সব ভিডিও এবং সংহতিমূলক কনটেন্ট ডিন অবিলম্বে মুছে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ফ্যাকাল্টি অ্যাডভাইজরকেও ডেকে পাঠানো হয়েছে, যার পর চাপের মুখে শিক্ষার্থীরা সংহতিমূলক সব পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সরাতে বাধ্য হচ্ছেন।

সূত্র: এনডিটিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights