যাত্রীবাহী ট্রেন চালু করতে চিঠি দেবে সরকার
রফিকুল ইসলাম রনি
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ‘ছাত্র আন্দোলনকে’ কেন্দ্র করে সারা দেশের ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। ওই সময় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চলাচলকারী যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেনও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর সময় গড়িয়েছে ২০ মাস। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় বসা ইউনূস সরকার ট্রেন চালানোর কথা বলে ভারতকে চিঠি দিয়েছে মোট তিনবার। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল এখনো বন্ধ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ব্যর্থ হলেও এবার নতুন করে উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে ভারতকে আবারও চিঠি দেওয়ার বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। গত ১২ মার্চ বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি চেয়ে বার্তা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে। এখন রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সম্মতি দিলেই রেল থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন যাবে। তার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতকে ফের চিঠি দেবে। আর ভারতীয় রেলওয়ে বোর্ডের সঙ্গে চলমান আলোচনা আরও জোরদার করবে বাংলাদেশ রেলওয়ে। যদিও বাংলাদেশের দিক থেকে যাওয়া আগের তিন চিঠির আনুষ্ঠানিক কোনো জবাব দেয়নি ভারত। তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে তখন ‘নিরাপত্তা’ ঝুঁকির করা বলা হয়েছিল। আর নির্বাচিত সরকার এলে ভারত সিদ্ধান্ত নেবে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়। শেখ রবিউল আলম মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরদিন যে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন সেখানেও বাংলাদেশ-ভারত ট্রেন চলাচলের ইস্যু নিয়ে প্রশ্ন হয়। জবাবে মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, দুই সপ্তাহের মধ্যে আলোচনা করে বিষয়টি ঠিক করা হবে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৩৮তম আন্তসরকার বৈঠকের প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সে বৈঠকে গত বছরের ৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়া বৈঠকের সিদ্ধান্তের অগ্রগতি তুলে ধরা হয়। আগের বৈঠকে চিঠি দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত এলেও অন্তর্বর্তী সরকার তাতে আপত্তি জানায়। তাই এখন আবার নতুন সরকারের অনুমতি পেতে মন্ত্রীর কাছে বার্তা পাঠানো হয়েছে।
মন্ত্রীর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ১২ মার্চ মন্ত্রী সেই নথি পেয়েছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত জানাবেন। ভারতের সঙ্গে ট্রেন চালুর বিষয়ে সরকার আগ্রহী। তাই এ বিষয়ে দ্রুতই সিদ্ধান্তে আসবে এবং গুরুত্ব পাবে। এর আগে ২০২৪ সালে ১৯ আগস্ট ও ২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর সচিব বরাবর এবং একই বছর ৩০ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ের কাছে সিদ্ধান্ত জানতে চেয়ে চিঠি দেয় রেলওয়ে।
আগের ট্রেন চলছে না, নতুন রুট চেয়ে ভারতকে চিঠি : সবশেষ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তিনটি ট্রেনে যাত্রী পরিবহন করা হতো। তবে নতুন রুট হিসেবে রাজশাহী-কলকাতা পথে আরও একটি ট্রেন চালুর বিষয়ে এরই মধ্যে ভারতীয় রেলওয়ে বোর্ডকে বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
আর রেলের সর্বশেষ সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়ের অনুমতি পেলে আন্তদেশীয় মৈত্রী, মিতালি ও বন্ধন এক্সপ্রেস ট্রেন পুনরায় চালু করার বিষয়ে আগের চিঠির ধারাবাহিকতায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে রেলপথ মন্ত্রণালয় আবারও চিঠি দেবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চলাচলরত যাত্রীবাহী ট্রেনের সঙ্গে যাত্রীদের অতিরিক্ত মালপত্র পরিবহনের জন্য লাগেজ ভ্যান সংযুক্ত করার বিষয়ে ভারতীয় রেলওয়েকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানো হবে।
জানতে চাইলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আমরা কাজ করব। সরকারকে জানানো হয়েছে। ভারতের সঙ্গে আলচনার জন্য আমরা প্রস্তুত। ভারতের সঙ্গে আলোচনার পদ্ধতি একটাই, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে চিঠি পাঠানো। আমরা এর আগেও চিঠি দিয়েছি। কিন্তু কোনো রেস্পন্স পাইনি।
এদিকে দুই দেশের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল আবার শুরু হলে ঢাকায় ‘বন্ধ’ থাকা ভিসার প্রক্রিয়া চালু করতে হবে ভারতকে। তা না হলে ট্রেন চলু হলেও তাতে যাত্রী পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, আমাদের হাতে খুব বেশি কিছু নেই। আমরা ট্রেন চালাতে চাই। ট্রেন চালানোর সব প্রস্তুতি আমাদের আছে। সিদ্ধান্ত পেলেই ট্রেন চালানো শুরু হয়ে যাবে।
ট্রেন চলাচল কবে বন্ধ হয় : ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই দেশের অভ্যন্তরে সব ধরনের ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিল রেলওয়ে। এরই ধারাবাহিকতায় ওই দিন থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যেও যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ১২ আগস্ট সারা দেশে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। কিন্তু তার পর এখনো বাংলাদেশ-ভারত যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল শুরু করা যায়নি। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আটটি ইন্টারচেঞ্জ থাকলেও পাঁচটি সচল আছে। এর মধ্যে তিনটি পথে যাত্রীবাহী ট্রেন নিয়মিত চলাচল করত।
২০২৪ সালের ১৭ জুলাই রাতে মিতালি এক্সপ্রেস ট্রেনটি নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে পৌঁছায়। ট্রেনটি পরদিন ১৮ জুলাই রাতে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে নিউ জলপাইগুড়ির উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উদ্ভুত পরিস্থিতিতে ট্রেনটির যাত্রা করা সম্ভব হয়নি। তার পর দীর্ঘদিন মিতালি এক্সপ্রেস ট্রেনের খালি রেক ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনে আটকে ছিল। পরে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থায় ট্রেনের রেক ভারত সীমান্তে পৌঁছে দেওয়া হয়। আর ঢাকা-নিউ জলপাইগুড়ির মধ্যে চলাচলকারী মিতালি এক্সপ্রেস ট্রেনসহ ঢাকা-কলকাতার মধ্যে চলাচলকারী মৈত্রী এক্সপ্রেস এবং খুলনা-কলকাতার মধ্যে চলাচলকারী বন্ধন এক্সপ্রেস ট্রেন বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
