যুক্তরাষ্ট্রে শেফ খলিলের ঈর্ষণীয় সাফল্য
লাবলু আনসার, যুক্তরাষ্ট্র
গণিতে মাস্টার্স ডিগ্রিধারী খলিল মার্কিন মুল্লুকে জয় করেছেন ভোজনরসিকদের হৃদয়। মানসম্মত খাবারে জনপ্রিয়তা পেয়েছে তাঁর ব্র্যান্ড খলিল বিরিয়ানি
যশোরের সন্তান খলিলুর রহমান ডিভি লটারি জিতে ২০০৮ সালে পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। নিউইয়র্কে এসে অডজব শুরু করেন। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে কালিনারি বিষয়ে মাস্টার্স করেছেন। চার বছর স্টাডি এবং আরও পাঁচ বছর এ পেশার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিজ্ঞতা থেকেই ছোট্ট পরিসরে নামেন রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়। এখন তাঁর ব্র্যান্ড খলিল বিরিয়ানির সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। উদ্যমী ব্যবসায়ী শেফ খলিল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘খলিল বিরিয়ানি এখন শুধু আমেরিকাতেই নয়, সারা বিশ্বে বাঙালি সমাজে পরিচিত ও সমাদৃত একটি নাম। এই খ্যাতি ধরে রাখার জন্য বেশ কিছু পরিকল্পনা রয়েছে আমার। এই ব্র্যান্ডকে ফ্র্যাঞ্চাইজ করতে চাই। আমার এই যে অর্জন, তা লিপিবদ্ধ করে রাখতে চাই। যাতে উদ্যমী মানুষেরা এই ধারা অনুসরণ করতে পারেন। বিশেষ করে আমি এই আমেরিকায় কালিনারি শিক্ষায় চার বছরের যে কোর্স সম্পন্ন করেছি সেই ধারা বাংলাদেশেও চালু করতে চাই। বাংলাদেশের মানুষ যাতে এই শিক্ষা নিয়ে বেকারত্ব দূর করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে এবং আর্থিকভাবে স্বয়ম্ভর হতে পারে, সে অভিপ্রায়ে আমি কাজ শুরু করেছি। বাঙালি হিসেবে নিজের দায়বদ্ধতা থেকে বাংলাদেশে একটি কারখানা করছি’-জানালেন শেফ খলিল। আমার রেস্টুরেন্টের সাফল্যের নেপথ্যে যে রহস্য রয়েছে সেই ইনগ্রেডিয়েন্ট, রেসিপির সমন্বয় ঘটিয়ে মসলা ফ্যাক্টরি গড়ছি। সেটির নাম ‘খলিল স্পাইস’। জন্মভূমি যশোরে এটির কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। আগামী বছর এ কারখানা থেকে খলিল মসল্লা, খলিল রাইসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্য বাজারজাত হবে ইনশাআল্লাহ। সব মিলিয়ে একটি মহাপরিকল্পনা রয়েছে। স্ত্রী এবং তিন সন্তান নিয়ে এই ব্রঙ্কসেই বাস করছেন শেফ খলিল। সন্তানরা স্কুল-কলেজ-ভার্সিটিতে যাচ্ছেন। ‘স্ত্রী হচ্ছেন আমার ব্যবসার মনিটরিং অধিকর্তা। সন্তানরাও সময়-সুযোগ পেলেই রেস্টুরেন্টের খোঁজখবর নেয়’ কমিউনিটির সর্বস্তরের মানুষের আন্তরিক সহযোগিতার কথা গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে বললেন খলিলুর রহমান, এযাবৎ শতাধিক সম্মাননা ক্রেস্ট, সাইটেশন, প্রক্লেমেশন জুটেছে আমার ভাগ্যে। সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্টের লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড এবং প্রফেশনাল সর্বোচ্চ সম্মান ‘ব্রিটিশ কারি অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছি ২০২২ সালে। বছরের সেরা শেফ হিসেবেও ইউএস সিনেট, কংগ্রেস, স্টেট, সিটির পাশাপাশি গত বছর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও সম্মানিত হয়েছি। কমিউনিটির রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে খলিলুর রহমান বলেন, আমাদের একটা ঐক্য প্রয়োজন। আমাদের মিলেমিশে একত্রিত হয়ে বাংলাদেশি ফুডকে প্রমোট করার জন্য কাজ করতে হবে। শুধু ব্যবসার সমৃদ্ধির জন্য ইন্ডিয়ান ফুড, পাকিস্তানি ফুড অথবা অন্য ফুডের নাম না দিয়ে যদি বাঙালি ফুড হিসেবেই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে পারি, তাহলে বাঙালি সংস্কৃতি ও খাদ্যকে বিশ্বদরবারে আরও মহিমান্বিত করতে সক্ষম হব। সবাই একমত হয়ে যদি কাজ করি তাহলে এই প্রত্যাশাও পূরণে সক্ষম হব। তিনি আরও বলেন, ব্রিটেনের মতো আমেরিকায়ও ‘আমেরিকান কারি অ্যাওয়ার্ড’ চালু করতে চাই, যারা ভালো করছেন তাদের মূল্যায়নের জন্য। বিশেষ করে এই ইন্ডাস্ট্রিতে ভালো শেফদের যথাযথ মূল্যায়ন, সত্যিকারের রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীদের মূল্যায়ন করতে চাই। এভাবে সারা পৃথিবীর শেফদের যদি ঐক্যবদ্ধ করতে পারি, খ্যাতি অর্জনকারী রেস্টুরেন্ট মালিকদের মূল্যায়ন করা সম্ভব হয় এবং এক পর্যায়ে এক কাতারে শামিল হতে পারি তাহলে এ ব্যবসার প্রতি মানুষের আগ্রহ আরও বাড়বে। আমি অতীতের মতো সামনের দিনেও গণমাধ্যমের সহযোগিতা আশা করছি যাতে আমেরিকান কারি অ্যাওয়ার্ড জাঁকজমকপূর্ণভাবে করতে সক্ষম হই। ব্রঙ্কস কমিউনিটি বোর্ডের মেম্বার শেখ শাহজাহান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, খলিলুর রহমানের মাধ্যমে বাঙালি খাদ্য যেমন বহুজাতিক এ সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে, একইভাবে কমিউনিটিও উপকৃত হচ্ছে। নবাগতদের কর্মসংস্থানেও উদার তিনি। করোনার দুঃসময়ে খলিলুর রহমানের সাহসী ভূমিকা রাখে খলিল বিরিয়ানি হাউস। বাঙালি, ভারতীয়, পাকিস্তানি, মিসরীয়, মেক্সিকান, চায়নিজ, স্প্যানিশ, আমেরিকান সবাই খলিল বিরিয়ানিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। বহুজাতিক আমেরিকান সমাজে হাজার বছরের ঐতিহ্যমণ্ডিত বাঙালি খাবারকে জনপ্রিয় করতে এখন প্রয়োজন সব রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীর ঐক্য।
