যুক্তরাষ্ট্র ইরান সংঘাত শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্যে কী ঘটতে পারে

অনলাইন ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও অনিশ্চয়তার ছায়া ঘন হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের টানটান উত্তেজনা এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে সামরিক সংঘাত এড়ানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। আটলান্টিক কাউন্সিলের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ পরিচালক এবং যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাস দমন ও বিশেষ অভিযানবিষয়ক প্রতিরক্ষা বিভাগের সদ্য সাবেক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি উইলিয়াম এফ ওয়েচসলার সম্ভাব্য মার্কিন হামলা নিয়ে দশটি পূর্বাভাস দিয়েছেন।

উইলিয়াম এফ ওয়েচসলারের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি শেষ মুহূর্তে শক্তিশালী সমঝোতা প্রস্তাব দেবেন না বলেই তাঁর ধারণা। গত দেড় বছরে ইরানের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হয়েছে। ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা, সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের সরকারের পতন, পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলা, দেশজুড়ে বিক্ষোভ—সব মিলিয়ে তেহরান চাপে রয়েছে। তবু ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার মতো কঠোর শর্ত মানার ইঙ্গিত এখনো দেয়নি ইরান।

অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুর্বল কোনো চুক্তি মেনে নেবেন না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি আরও ঘনালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আগাম হামলার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলেও পূর্বাভাস রয়েছে। গত বছর সম্ভাব্য দুর্বল পারমাণবিক চুক্তির আশঙ্কায় ইসরায়েল একতরফা পদক্ষেপ নিয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত মার্কিন হস্তক্ষেপ ডেকে আনে।

ওয়াশিংটনের সামনে তিনটি সম্ভাব্য পথের কথা উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষক। প্রথমত বল প্রয়োগ জোরদার, যা সীমিত সময়ের প্রতীকী হামলা হতে পারে এবং ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী বিশেষ করে আইআরজিসিকে লক্ষ্য করতে পারে। দ্বিতীয়ত সামরিক অবকাঠামোর পতন ঘটানো, অর্থাৎ বিস্তৃত সামরিক স্থাপনা ধ্বংসের পরিকল্পনা। তৃতীয়ত নেতৃত্ব অপসারণ, যার লক্ষ্য হবে শাসন কাঠামো ভেঙে দেওয়া।

উইলিয়াম এফ ওয়েচসলারের ধারণা, ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত সীমিত বল প্রয়োগের পথই বেছে নিতে পারেন, যদিও বিষয়টি অনিশ্চিত। যদি যুক্তরাষ্ট্র সীমিত হামলা চালায়, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি প্রতীকী পাল্টা জবাব দিতে পারেন। তবে এখানেই বড় ঝুঁকি। ভুল হিসাবের কারণে যদি মার্কিন হতাহতের ঘটনা ঘটে, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত সামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের পর্যায়ে চলে যেতে পারে।

সবচেয়ে অস্থির অধ্যায় হতে পারে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। মার্কিন হামলার পর ইরানি জনগণ রাস্তায় নামতে পারেন এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হয়নি। বড় আকারের প্রতিবাদ শুরু হলে নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর দমন পীড়ন চালাতে পারে, যা ব্যাপক প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি করবে।

যদি বিক্ষোভকারীদের ওপর গণহত্যা ঘটে, তাহলে ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও বিস্তৃত সামরিক অভিযান শুরু করতে পারেন। সেক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সূচনা ঘটতে পারে এবং ইসরায়েলও সরাসরি যুক্ত হতে পারে।

পূর্ণাঙ্গ সংঘাতের ফলাফল সামরিক ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই অনিশ্চিত। ইরানের শাসন ব্যবস্থার পতন হলে পরবর্তী পরিস্থিতি কী হবে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ কঠোর সামরিক শাসনের আশঙ্কা করছেন, কেউ গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা দেখছেন, আবার কেউ রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথাও বলছেন।

বিশ্লেষকের উপসংহার স্পষ্ট। প্রথম দফার সামরিক পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াই ঠিক করে দেবে সংঘাত কোন দিকে গড়াবে। সীমিত হামলা হয়তো নিয়ন্ত্রিত বার্তা দিতে পারে, কিন্তু ধারাবাহিক ভুল সিদ্ধান্ত পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য আবারও এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।

সোর্স
আটলান্টিক কাউন্সিল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights