যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোর আর্থিক সহায়তায় ওপেকের ১৫০ কোটি ডলারের তহবিল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি যখন টালমাটাল, ঠিক তখনই উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর পাশে দাঁড়াতে এক বিশাল আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট। ভিয়েনাভিত্তিক এই সংস্থাটি জানিয়েছে, যুদ্ধলব্ধ জ্বালানিসংকট, পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অস্থিরতা সামাল দিতে তারা ১৫০ কোটি ডলারের (১.৫ বিলিয়ন ডলার) একটি বিশেষ প্যাকেজ চালু করেছে। এই অর্থ মূলত সেই সব দেশকে দেওয়া হবে যারা যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপে পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে হিমশিম খাচ্ছে।

সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই বিশাল অঙ্কের অর্থ আগামী ২০২৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে বিতরণ করা হবে। তবে এটি কোনো এককালীন ঢালাও বরাদ্দ নয়, বরং দেশগুলোর সুনির্দিষ্ট চাহিদার ওপর ভিত্তি করে এই অর্থ ছাড় করা হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে খাদ্য ও জ্বালানির দাম যেভাবে আকাশচুম্বী হয়েছে, তাতে অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের পক্ষেই নিজেদের অর্থনীতি সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই বাস্তবতায় ওপেকের এই সময়োপযোগী ঘোষণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

এই সহায়তার একটি বড় অংশ ব্যয় করা হবে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের সরবরাহ চেইন সুরক্ষিত রাখতে। যুদ্ধের কারণে বিশেষ করে খাদ্যশস্য এবং সারের বৈশ্বিক বাজার চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওপেক ফান্ডের লক্ষ্য হলো, উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকার যেন কোনো সংকটে না পড়ে এবং তাদের নাগরিকদের জন্য পর্যাপ্ত খাবার ও সারের জোগান নিশ্চিত করতে পারে। এ ছাড়া জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে ডলারের ঘাটতি মেটাতেও এই তহবিল থেকে দেশগুলোকে সহজ শর্তে ঋণ বা অনুদান প্রদান করা হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্যাকেজটি শুধুমাত্র একটি আর্থিক সাহায্য নয়, বরং এটি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল করার একটি বড় প্রয়াস। ইরান যুদ্ধের ফলে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন যেমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিমা ও পরিবহন খরচ। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর। ওপেকের এই তহবিল থেকে অর্থ পেলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং স্থানীয় বাজার স্থিতিশীল করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে।

ওপেক ফান্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমান সংকটকাল উত্তরণে তারা বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মতো অন্যান্য সংস্থাগুলোর সঙ্গেও সমন্বয় করে কাজ করবেন। তারা চান না কোনো দেশ অর্থের অভাবে মানবিক সংকটের মুখে পড়ুক। বিশেষ করে আফ্রিকা, এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার যেসব দেশ আমদানিনির্ভর, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এর ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যের যে মন্থর গতি তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সবশেষে, ১৫০ কোটি ডলারের এই সহায়তা প্যাকেজটি উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। যখন বড় শক্তিগুলো ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত, তখন ওপেকের মতো সংস্থার এমন মানবিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ প্রশংসিত হচ্ছে। এই তহবিলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হলে যুদ্ধকালীন কঠিন সময়েও অনেক দেশ তাদের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে পারবে এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হবে না। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই যোগ্য দেশগুলোর জন্য এই তহবিলের প্রথম কিস্তি ছাড় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সূত্র: আল জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights