যেভাবে মাফিয়ারা মিয়ানমারের ‘স্ক্যাম কারখানাগুলো’ পরিচালনা করে

অনলাইন ডেস্ক

মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড সীমান্তের কাছে গড়ে ওঠা কে কে পার্ক যেন এক নরককুণ্ড। ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে তুলে আনা তরুণ-তরুণীদের দাস হিসেবে খাটিয়ে তৈরি করা হয়েছে এক বিশাল অনলাইন প্রতারণা কারখানা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের (ডিডব্লিউ) সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উন্মোচিত হয়েছে এই নির্মম ও ভয়াবহ অপরাধ সাম্রাজ্যের মূল চিত্র।

উন্নত জীবনের আশায় আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে থাইল্যান্ডে পাড়ি জমানো তরুণরা বিমানবন্দরে পা রাখার পরেই বুঝে যান, তারা কোনো বৈধ সংস্থায় যোগ দিতে আসেননি। ব্যাংকক বিমানবন্দর থেকেই তাদের বিভ্রান্ত করে দীর্ঘ আট ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে থাই সীমান্ত শহর মে সটে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে সশস্ত্র পাহারায় নদী পার করে জোরপূর্বক বন্দি করে ফেলা হয় মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী নিয়ন্ত্রিত কে কে পার্কের ভেতরে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, মিয়ানমারের এমন বিভিন্ন স্ক্যাম সেন্টারে বর্তমানে এক লাখেরও বেশি মানুষকে জোর করে অপরাধমূলক কাজে নিয়োগ করা হয়েছে।

বেঁচে ফেরাদের ভাষ্যমতে, এই কম্পাউন্ডের ভেতরে একেকজনকে দিনে টানা ১৭ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য করা হয়। ছুটি বা বিশ্রামের কথা বললে জোটে অমানুষিক নির্যাতন, এমনকি হত্যার হুমকিও। যারা তাদের নির্দেশিত উপায়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও চীনের নাগরিকদের প্রতারিত করতে অস্বীকৃতি জানায়, তাদের ভাগ্যে জোটে অনাহার, নির্মম শারীরিক অত্যাচার এবং প্রতি সপ্তাহে প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড।

কিন্তু কারা চালাচ্ছে এই নরক? কে কে পার্ক থেকে প্রাপ্ত গোপন ছবি ও ভুক্তভোগীদের বর্ণনা থেকে জানা গেছে, সেখানকার নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সহযোগী এক সময়ের বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘বর্ডার গার্ড ফোর্স’ (বিজিএফ)। তারা ভূখণ্ড ও নিরাপত্তার সুযোগ দিলেও এই সাম্রাজ্যের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক চীনা মাফিয়া। নিখুঁত আর্থিক নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে শত শত কোটি ডলার হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই অবৈধ অর্থ লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ডিজিটাল ওয়ালেটগুলোর সরাসরি যোগাযোগ পাওয়া গেছে থাইল্যান্ডভিত্তিক চীনা ব্যবসায়ী ওয়াং ই চেংয়ের সঙ্গে, যিনি একটি কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সমিতির পদমর্যাদা ব্যবহার করে অপরাধের আড়াল তৈরি করেছিলেন।

এই জাল বহুদূর বিস্তৃত। ওয়াংয়ের যোগসূত্র শেষ পর্যন্ত পৌঁছায় কুখ্যাত চীনা মাফিয়া ডন ওয়ান কুওক কোই ওরফে ‘ব্রোকেন টুথ’-এর দরবারে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত এই মাফিয়া প্রধান আন্তর্জাতিক সংগঠন ও সাংস্কৃতিক বিনিময় কেন্দ্র খুলে আড়ালে নিজস্ব গ্যাং পরিচালনা করছেন।

মার্কিন ইনস্টিটিউট অব পিসের বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মাফিয়া চক্রগুলো নিজেদের স্বার্থে চীনের আন্তর্জাতিক মেগা প্রকল্প ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর নাম ভাঙিয়ে বিশ্বব্যাপী জাল বিস্তার করছে। আন্তর্জাতিক নানা যৌথ অভিযান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি সত্ত্বেও এই বৈশ্বিক অপরাধ নেটওয়ার্ক ক্রমশ আরও শক্তিশালী হয়ে আফ্রিকা, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় ডালপালা ছড়িয়ে দিচ্ছে, যার খুব সামান্য অংশই এখন পর্যন্ত জনসমক্ষে এসেছে।

সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights