রাশিয়া-উত্তর কোরিয়ার প্রথম সড়ক সেতু চালু

অনলাইন ডেস্ক

রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে প্রথমবারের মতো সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপনকারী একটি নতুন সেতু চালু হয়েছে। তুমেন নদীর ওপর নির্মিত এই সেতুর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে পণ্য ও যাত্রী পরিবহন আরও সহজ হবে।

তবে ইউক্রেনভিত্তিক অনুসন্ধানী সংস্থা ট্রুথ হাউন্ডসের দাবি, বাণিজ্য ও পর্যটনের পাশাপাশি সেতুটি মূলত রাশিয়াকে ইউক্রেন যুদ্ধে সহায়তার জন্য একটি গোপন সামরিক সরবরাহ করিডর হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

সোমবার সেতুটির উদ্বোধন করা হয়। উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, সেতুটি দুই দেশের মধ্যে ‘জনবল বিনিময়, পর্যটন ও বাণিজ্য’ সম্প্রসারণে ব্যবহার করা হবে।

রুশ প্রধানমন্ত্রী মিখাইল মিশুস্তিন সেতুটিকে দুই দেশের বন্ধুত্বের ‘নতুন প্রতীক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী পাক থায়ে সং একে ‘ঐতিহাসিক ঘটনা’ বলে উল্লেখ করেছেন।

রুশ রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩০০টি যানবাহন এবং ২ হাজার ৩২৩ জন মানুষ এই সেতু দিয়ে পারাপার করতে পারবেন।

ইউক্রেন যুদ্ধে সামরিক সহযোগিতার নতুন পথ?
নতুন সেতুটি চালুর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান সামরিক সহযোগিতা। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের সম্পর্ক দ্রুত ঘনিষ্ঠ হয়েছে।

২০২৪ সালে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উত্তর কোরিয়া সফরের সময় দুই দেশ একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি সই করে। ওই চুক্তিতে কোনও পক্ষ ‘আগ্রাসনের’ শিকার হলে একে অপরকে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

এই প্রেক্ষাপটে নতুন সড়ক যোগাযোগকে সামরিক ও কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইউক্রেনভিত্তিক অনুসন্ধানী সংস্থা ট্রুথ হাউন্ডস এক বিবৃতিতে বলেছে, ২০২৪ সালের কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তির সুযোগ কাজে লাগিয়ে সেতুটি উত্তর কোরিয়ার সামরিক সদস্য, নির্মাণশ্রমিক এবং ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের সরাসরি রাশিয়ায় পাঠাতে ব্যবহৃত হতে পারে।

সংস্থাটির মতে, একই পথে রাশিয়ার প্রযুক্তি, সরঞ্জাম ও অন্যান্য সম্পদ উত্তর কোরিয়ায় যাওয়ার সুযোগও তৈরি হবে।

উত্তর কোরিয়ার অস্ত্র সরবরাহ বাড়তে পারে
সেতু চালুর পর সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব হতে পারে রাশিয়ায় উত্তর কোরিয়ার অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ আরও সহজ হওয়া।

দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার গবেষকদের হিসাবে, উত্তর কোরিয়া ইতোমধ্যে জাহাজের মাধ্যমে রাশিয়াকে প্রায় ৭ থেকে ১৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র ও কামানের গোলা সরবরাহ করেছে।

এছাড়া আনুমানিক ১১ হাজার উত্তর কোরীয় সেনা বর্তমানে রাশিয়ায় ইউক্রেনীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে বলে বিভিন্ন গোয়েন্দা ও গবেষণা সূত্রের দাবি।

নতুন সড়ক সেতু চালুর ফলে এত দিন সমুদ্রপথে যেসব সরবরাহ পরিবহন করা হতো, তার একটি অংশ স্থলপথে আরও দ্রুত ও তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিতে স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হতে পারে। যদিও সেতুটি সামরিক সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে—এমন কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা রাশিয়া বা উত্তর কোরিয়া দেয়নি।

দুই দেশের মধ্যে একমাত্র সড়ক যোগাযোগ ছিল অস্থায়ী
রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে আগে থেকেই আকাশ ও রেল যোগাযোগ রয়েছে। কিন্তু এত দিন দুই দেশের মধ্যে কোনও স্থায়ী সড়ক যোগাযোগ ছিল না।

রয়টার্সের তথ্যানুযায়ী, বিশেষ ব্যবস্থায় রেলসেতুর ওপর কাঠের পাটাতন বসিয়ে গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা করা হতো। সেটিই ছিল কার্যত দুই দেশের মধ্যে একমাত্র সড়ক যোগাযোগ।

নতুন সেতু চালুর ফলে সেই অস্থায়ী ব্যবস্থার অবসান হলো।

স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে বিবিসি জানিয়েছিল, প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন সেতুটির পাশাপাশি বেশ কয়েকটি নতুন সংযোগ সড়ক, সীমান্ত চৌকি, সহায়ক অবকাঠামো এবং পার্কিংয়ের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।

রুশ সরকার জানিয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে সেতুটি মূলত পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত হবে। চলতি বছরের শেষ দিকে যাত্রী পরিবহনও শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় শক্তিশালী গতি
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভিডিও সংযোগের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে মিশুস্তিন বলেন, নতুন সেতু দুই দেশের বাণিজ্য, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতার আরও বিকাশে ‘শক্তিশালী গতি’ সৃষ্টি করবে।

মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের বর্তমান সম্পর্ককে তিনি ‘অভূতপূর্ব উচ্চতায়’ পৌঁছেছে বলেও উল্লেখ করেন।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানোই এই সেতুর গুরুত্বের একমাত্র কারণ নয়। ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে যে অস্ত্র, সেনা ও শ্রমিক বিনিময় গড়ে উঠেছে, নতুন সড়ক যোগাযোগ সেটিকে আরও কার্যকর করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) ভিক্টর চা মে মাসে বিবিসি ভেরিফাইকে বলেন, সেতু নির্মাণের গতি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের পরিমাণের একটি প্রতিফলন।

তার মতে, এই তৎপরতার বড় অংশই রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য উত্তর কোরিয়ার সেনা, অস্ত্র, গোলাবারুদ ও শ্রমিক সরবরাহের সঙ্গে সম্পর্কিত।

ভিক্টর চা বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের আগে উত্তর কোরিয়া ও তার দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে এই যোগাযোগ ছিল অন্যতম নিষ্ক্রিয় সীমান্ত সংযোগ।

রাশিয়ায় উত্তর কোরীয় শ্রমিকের উপস্থিতি
নতুন সড়কপথের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হতে পারে উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের রাশিয়ায় যাতায়াত।

দক্ষিণ কোরিয়ার একটি হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়ার নির্মাণ প্রকল্প ও বনাঞ্চলের কাঠ কাটার কাজে প্রায় ১০ হাজার উত্তর কোরীয় নাগরিক কাজ করছেন।

উত্তর কোরিয়ার শ্রমিকদের বিদেশে পাঠানোর ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু শ্রমিক শিক্ষার্থী ভিসাসহ বিভিন্ন বৈধ কাগজপত্রের আড়ালে রাশিয়ায় প্রবেশ করছেন।

নতুন সড়ক যোগাযোগ চালু হওয়ায় শ্রমিকদের যাতায়াত এবং দুই দেশের মধ্যে জনবল বিনিময় আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পর্যটনেও নতুন সম্ভাবনা
সেতুটি শুধু বাণিজ্য ও শ্রমিক পরিবহনের জন্য নয়, পর্যটন খাতেও নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

২০২৪ সালে রাশিয়ার নাগরিকদের উত্তর কোরিয়া ভ্রমণের অনুমতি দেওয়ার পর দেশটিতে ধীরে ধীরে রুশ পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ং এবং উপকূলীয় পর্যটনকেন্দ্র ওয়ানসান-কালমায় তাদের জন্য পর্যটন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

তবে অন্যান্য দেশের পর্যটকদের ক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়ার কঠোর বিধিনিষেধ এখনও বহাল রয়েছে।

৪৯৫ দিনে নির্মাণ শেষ
২০২৪ সালে পুতিনের উত্তর কোরিয়া সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে সেতু নির্মাণের চুক্তি হয়। ২৪ বছর পর সেটিই ছিল পুতিনের প্রথম উত্তর কোরিয়া সফর। ওই সফরেই দুই দেশ কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তিতে পৌঁছায়।

এর পর ২০২৫ সালে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। কিছুটা বিলম্বের পর মাত্র ৪৯৫ দিনে এর নির্মাণ শেষ করা হয়েছে।

সেতুটি চালুর ফলে এখন রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে স্থলপথে পণ্য, মানুষ ও সম্ভাব্য শ্রমিক পরিবহনের একটি নতুন ও স্থায়ী রুট তৈরি হলো।

বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে দুই দেশের দীর্ঘদিনের সীমান্ত যোগাযোগ কেবল বাণিজ্যিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ই খুলবে না; ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে মস্কো-পিয়ংইয়ংয়ের সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতাকেও আরও গভীর করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। সূত্র: বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights