রাষ্ট্র পুনর্গঠন অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে জোর

শফিকুল ইসলাম সোহাগ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জনমুখী ইস্যু নিয়ে ইশতেহার তৈরি করছে বিএনপি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০ এবং তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফার সংমিশ্রণ রয়েছে নির্বাচনি ইশতেহারে। শুধু নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয় বরং রাষ্ট্র পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও মানবসম্পদ রূপান্তরের সমন্বিত রূপরেখা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ইশতেহারে আটটি প্যাকেজে দেশ গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, ইশতেহার তৈরির কাজ প্রায় সম্পন্ন। যেকোনো দিন ঘোষণা করা হবে।

বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘ইশতেহার তৈরির কাজ প্রায় শেষ। আশা করি, শিগগিরই আমরা ঘোষণা করতে পারব।’ সংশ্লিষ্টরা জানান, এবারের ইশতেহারে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বিএনপি ঘোষিত রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা, ভিশন-২০৩০, জুলাই জাতীয় সনদ এবং তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা। এ ছাড়া বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের জন্য আটটি বিশেষ খাতের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে। ৩১ দফার মধ্যে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, বাকস্বাধীনতা, স্বচ্ছ প্রশাসন, জাতীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারসহ কয়েকটি প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

ইশতেহারে দেশ গড়ার পরিকল্পনায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, পরিবেশ, কর্মসংস্থান ও ধর্মীয় নেতাদের জীবনমান উন্নয়নকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যের মূল বিষয়গুলোও ইশতেহারে প্রতিফলিত হয়েছে। তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ আ প্লান’ এবং দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের আদলে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ তৈরির পরিকল্পনা এবং বিএনপি নির্বাচিত হলে ১৮ মাসে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয়টিও রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

জানা যায়, এবারের নির্বাচনে ভোটার পৌনে ১৩ কোটি। নতুন ভোটার প্রায় ১ কোটি। ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সি ভোটারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ কোটি। তরুণ ভোটাররা নির্বাচনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। গণ অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তরুণ সমাজের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ অনেক বেশি। তাই তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি। তাদের জীবনমানের বিষয়টিও নজরে রাখা হয়েছে। নারী ভোটারসংখ্যা ৬ কোটির বেশি হওয়ায় নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে প্রতিটি পরিবারে প্রাপ্তবয়স্ক নারীর নামে ফ্যামিলি কার্ড চালু করবে, যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাশ্রয়ী দামে পাওয়া যায়। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে সার, উন্নত বীজ ও কৃষিপ্রযুক্তি পাবে কৃষকরা। প্রত্যেকের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়াসহ শক্তিশালী প্রাইমারি হেলথকেয়ার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার বিষয়টি উল্লেখ থাকবে। চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা এবং দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে তরুণদের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ক্রীড়াকেও পেশা হিসেবে গ্রহণযোগ্য করতে সব স্তরে খেলাধুলার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। নবায়নযোগ্য শক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিং বাড়িয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করা হবে। কর্মসংস্থানে এসএমই, বস্ত্র অর্থনীতি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আইসিটি খাতে নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি করা হবে। বিদেশি শ্রমবাজারে নতুন সুযোগ খুঁজে আরও বেশি তরুণকে পাঠানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। ধর্মীয় নেতাদের মাসিক সম্মানির ব্যবস্থা করা হবে।

রাষ্ট্র পুনর্গঠন অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে জোরবেকারত্ব দূর করতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর বিশেষ গুরুত্ব থাকছে বিএনপির ইশতেহারে। ক্ষমতায় গেলে প্রথম ১৮ মাসের মধ্যে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত শিক্ষিত বেকারদের বেকার ভাতা দেওয়া হবে। প্রতিটি জেলায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে তোলার জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। বিদেশি ভাষা শিক্ষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বছরে ২০ লাখ মানুষের বিদেশে কর্মসংস্থান তৈরি করা হবে।

ফ্রিল্যান্সার ও প্রযুক্তিবিদদের জন্য পেপ্যালসহ আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে চালু করার উদ্যোগ থাকছে বিএনপির ইশতেহারে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে মাধ্যমিক পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক, বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা, স্বল্প খরচে বিদেশে কর্মী পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রবাসে যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের জন্য সহজ ঋণ এবং বিমানবন্দর ও দূতাবাসে হয়রানিমুক্ত সেবার প্রতিশ্রুতিও থাকছে।

গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, সংসদে উচ্চকক্ষ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ, মানবাধিকার রক্ষা ও দুর্নীতিবিরোধী কাঠামো শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি থাকছে বিএনপির ইশতেহারে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক বাতিল, জুডিশিয়াল কমিশন গঠন ও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনঃপ্রবর্তনের কথাও উল্লেখ করা হচ্ছে। বিগত সরকারের আমলের অর্থ পাচার ও দুর্নীতির তদন্ত করে শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনার আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা থাকছে।

কৃষি খাত নিয়ে ইশতেহারে বড় পরিকল্পনা থাকছে। সারা দেশে খাল ও নদীখননের মাধ্যমে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা থাকছে। কৃষিকার্ড, কৃষি উপকরণের দাম কমানো, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত, কৃষিঋণ সহজ করা, ধান-চাল কেনার স্বচ্ছ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও থাকছে। জেলা পর্যায়ে কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাতে কোল্ড স্টোরেজ সংখ্যা বাড়ানো, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন, কৃষি বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করে উৎপাদনে রূপান্তর করাসহ নানান উপকরণ কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি যুক্ত হচ্ছে ইশতেহারে।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তায় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, নিরাপত্তা সেল, ধর্মীয় উৎসবে রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও সাম্প্রদায়িক হামলা প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা ও সব ধর্মের উপাসনালয়ের প্রধানদের সমান মাসিক সম্মানি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকছে।

ইশতেহারে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের আদলে (এনএইএস) সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা, প্রত্যেক নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা, স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশের বেশি বরাদ্দ; সব হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রকে জবাবদিহির আওতায় আনা, ২৪ ঘণ্টা হেল্পলাইন, জেলা পর্যায়ের হাসপাতাল ও বিশেষায়িত স্তরের স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালীকরণ এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সারা দেশে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকছে।

দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার মানোন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, ফ্যামিলি কার্ড, কারিগরি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়নসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাত রয়েছে আমাদের প্রস্তাবে। আমরা প্রতিদিন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এই পরিকল্পনাগুলো তুলে ধরছি; ইশতেহারে এর সবকিছুর প্রতিফলন থাকবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights