রিটার্নে আয়-সম্পদের তথ্য গোপন করলে বিপদ

তনিমা রহমান

→ বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট রাজস্ব ও আর্থিক নীতি বিশেষজ্ঞ, অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য। আয়কর রিটার্ন সম্পর্কে বাংলাদেশ প্রতিদিনের পাঠকদের বিস্তারিত জানিয়েছেন

→ চলতি করবর্ষে সাধারণ করদাতার করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লাখ টাকা। নারী এবং ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সি করদাতার ক্ষেত্রে এ সীমা সাড়ে ৪ লাখ টাকা। নির্ধারিত সীমার বেশি আয় হলে রিটার্ন দাখিল এবং প্রযোজ্য কর পরিশোধ করতে হবে

আয়কর নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো ভয় ও বিভ্রান্তি কমেনি। কত টাকা আয় হলে রিটার্ন দিতে হবে, কোন আয় দেখাতে হবে, সম্পদের হিসাব কীভাবে দিতে হবে, রিটার্ন জমা দেওয়ার পর কোনো কাগজপত্র সংরক্ষণ করতে হবে-এসব বিষয়ে অনেকেরই পরিষ্কার ধারণা নেই। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য ড. সৈয়দ মো. আমিনুল করিম।

তিনি বলেন, চলতি করবর্ষে সাধারণ করদাতার করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লাখ টাকা। নারী এবং ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সি করদাতার ক্ষেত্রে এ সীমা সাড়ে ৪ লাখ টাকা। নির্ধারিত সীমার বেশি আয় হলে রিটার্ন দাখিল এবং প্রযোজ্য কর পরিশোধ করতে হবে। টিআইএন নেওয়ার পরও রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

তাঁর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১ কোটি ৩৫ লাখ মানুষের টিআইএন থাকলেও রিটার্ন দাখিল করেন প্রায় ৪৫ লাখ। ব্যাংক হিসাব খোলা, পাসপোর্ট, ক্রেডিট কার্ড, নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও ক্লাবের সদস্যপদসহ অন্তত ৩৩ ধরনের সেবা নিতে টিআইএন ও রিটার্নের প্রমাণ প্রয়োজন হয়।

ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে মোট বা গ্রস আয়ই করযোগ্য আয় নয়। নিয়ম অনুযায়ী ব্যবসার অনুমোদিত খরচ বাদ দিয়ে নিট আয় হিসাব করতে হয়। যেমন-৯ লাখ টাকা গ্রস আয় হলে উদাহরণ হিসেবে এক-তৃতীয়াংশ বা ৩ লাখ টাকা খরচ বাদ দিয়ে নিট আয় দাঁড়াবে ৬ লাখ টাকা। চাকরিজীবীদের বেতন ও ভাতার ক্ষেত্রেও নির্ধারিত নিয়মে করযোগ্য আয় হিসাব করা হয়। তিনি বলেন, ভাড়া থেকে আয়ের ক্ষেত্রে মেরামত বাবদ ২৫ শতাংশ এবং পৌরসভা ও ভূমি উন্নয়ন করের মতো নির্দিষ্ট খরচ বাদ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

রিটার্নে শুধু আয় দেখালেই হবে না; সম্পদের হিসাবও সঠিকভাবে দিতে হবে। পেনশনের মতো করমুক্ত আয় হলেও তা রিটার্নে উল্লেখ করা প্রয়োজন। আমিনুল করিম বলেন, সম্পত্তি, ব্যাংক হিসাব, বিনিয়োগ এবং জীবনযাত্রার ব্যয়-খাবার, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, সন্তানের পড়াশোনাসহ প্রয়োজনীয় খরচের তথ্যও রিটার্নে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে দেখাতে হবে।

অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান বা আয় করেন না এমন স্ত্রীর নামে থাকা সঞ্চয়পত্র কিংবা বিনিয়োগের আয় নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মূল উপার্জনকারী অভিভাবকের রিটার্নে দেখাতে হয়।

তিনি বলেন, সঞ্চয়পত্র, শেয়ারবাজার ও ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগে নির্দিষ্ট শর্তে কর রেয়াত পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ব্যাংক, পণ্য সরবরাহ বা আমদানির সময় কেটে নেওয়া উৎসে কর বা টিডিএসও মোট করের সঙ্গে সমন্বয় করা যায়।

আমিনুল করিম বলেন, করমুক্ত আয়ের সীমা অতিক্রম করলে ন্যূনতম ৫ হাজার টাকা আয়করের বিধান রয়েছে। ১ হাজার ৫০০ সিসির ব্যক্তিগত গাড়ির ফিটনেস নবায়নের সময় দেওয়া ২৫ হাজার টাকা অগ্রিম করও রিটার্নে সমন্বয় করা যায়।

রিটার্ন জমা দেওয়ার পর এর কপি, সার্কেল রিসিভ, বেতন সনদ, ব্যাংক সুদের তথ্য, সঞ্চয়পত্রের রসিদসহ সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র সংরক্ষণ করা উচিত। তিনি বলেন, অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের সুযোগ থাকায় প্রক্রিয়াটি আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। প্রয়োজনে নিবন্ধিত আয়কর আইনজীবীর সহায়তাও নেওয়া যায়। ইচ্ছাকৃতভাবে আয় বা সম্পদের তথ্য গোপন করলে আইনগত ব্যবস্থা হতে পারে। তবে ভুলবশত কোনো তথ্য বাদ পড়লে নির্ধারিত নিয়মে রিটার্ন সংশোধনের সুযোগ রয়েছে।

তিনি আরও জানান, ২০২৯ সালের মধ্যে আয়কর ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ডিজিটাল ও ‘নো-ইন্টারফেস’ করার লক্ষ্য রয়েছে। এতে করদাতার সঙ্গে কর কর্মকর্তার সরাসরি যোগাযোগ এবং নগদ লেনদেনের প্রয়োজন আরও কমে আসবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights