লিবিয়ায় টর্চার সেলে ৬ যুবক, মুক্তিপণের জন্য করা হচ্ছে নির্যাতন

কুমিল্লা প্রতিনিধি
অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার প্রলোভনে পড়ে লিবিয়ার অন্ধকার টর্চার সেলে আটকা পড়েছেন কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার ৬ যুবক। মানবপাচারকারী চক্রের হাতে জিম্মি এসব যুবকদের মুক্ত করতে পরিবারের কাছে দাবি করা হচ্ছে দেড় কোটি টাকা মুক্তিপণ। টাকা না দিলেই চলছে নির্যাতন, সেই নির্যাতনের ভিডিও পাঠানো হচ্ছে স্বজনদের কাছে।

যুবকরা হলেন-মনোহরগঞ্জ উপজেলার খিলা ইউনিয়নের দিশাবন্দ গ্রামের শাহাদাত হোসেন (২০), মানিকুল ইসলাম (২০), মো. সোহেল (২৭), তাজ মোহাম্মদ (২৫), ফয়সাল (২০) এবং লক্ষণপুর ইউনিয়নের বেতিয়াপাড়া গ্রামের মেহেদী হাসান (২১)।

মানিকুল ইসলামের মা বলেন, সম্পত্তি বিক্রি করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম, যাতে সে পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু দালাল মানিক ইতালিতে নেওয়ার কথা বলে প্রতারণার মাধ্যমে তাকে লিবিয়ায় নিয়ে মানবপাচারকারী চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়। সেখানে সদস্যরা প্রতিদিন আমার ছেলের ওপর নির্মম নির্যাতন চালাচ্ছে। তাকে ঠিকমতো খাবারও দেওয়া হয় না। মারধর করে রক্তাক্ত অবস্থার ভিডিও আমাদের কাছে পাঠানো হচ্ছে। এরপর আমার ছেলেকে মুক্তি দেওয়ার শর্তে ২৭ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছে। তাকে নিরাপদে আমার বুকে ফিরিয়ে দিতে সরকারের কাছে বিনীত দাবি জানাচ্ছি।

মানিকুলের বাবা মাহবুবুর রহমান ও মেহেদী হাসানের বাবা শাহ আলম জানান, প্রায় ৮-৯ মাস আগে দিশাবন্দ গ্রামের বেলাল হোসেনের ছেলে মানিকের মাধ্যমে তার ভাই সামছুল আলমকে ২০ লাখ ও ১৮ লাখ টাকা করে মোট ৩৮ লাখ টাকা দেওয়া হয় ইতালি পাঠানোর জন্য। কিন্তু ইতালি নেওয়ার বদলে তাদের লিবিয়ায় আটকে রেখে এখন চরম নির্যাতন করা হচ্ছে। গত ১৫-২০ দিন ধরে এদের একটি গোপন আস্তানায় আটকে রেখে জনপ্রতি ২৫ লাখ টাকা করে মোট দেড় কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করছে পাচারকারীরা। নির্যাতনের লোমহর্ষক দৃশ্য ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপে স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে টাকা আদায়ের জন্য মানসিক চাপ তৈরি করা হচ্ছে।

ফয়সালের বাবা ছিদ্দিকুর রহমান জানান, আমার সন্তান জীবিত না মৃত-এখনো দালাল মানিক আমাকে নিশ্চিত করে কিছু জানায়নি। তবে তার সঙ্গে থাকা আমাদের এলাকার ছেলেরা জানিয়েছে, আমার সন্তানকে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে। এখন তারা বলছে, লাশ দেশে আনতেও দালাল চক্রকে ১৭ লাখ টাকা দিতে হবে। একজন অসহায় বাবা হিসেবে আমি আমার সন্তানের মরদেহটা অন্তত দেশে ফিরিয়ে এনে শেষবারের মতো দেখতে চাই।

যুবকদের জিম্মি ও নির্যাতনের লোমহর্ষক ভিডিও এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর গত ১০-১২ দিন ধরে অভিযুক্ত দালাল সামছুল আলমসহ তার পরিবারের সব সদস্য ঘরবাড়ি ছেড়ে পলাতক। লিবিয়ায় অবস্থানরত মূল দালাল মানিকও এখন ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কোনো ফোন ধরছেন না। নিঃস্ব পরিবারগুলো ইতোমধ্যে প্রিয়জনদের অক্ষত অবস্থায় ফিরে পেতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন এবং সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

এ বিষয়ে মনোহরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাকসুদ আহমেদ জানান, অবৈধ পথে কে, কীভাবে কোন দালালের মাধ্যমে বিদেশে গিয়েছেন, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা লিখিত অভিযোগ পুলিশ পায়নি। তবে অভিযোগ পেলে দ্রুত কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights