শঙ্কায় অন্তঃসত্ত্বা নারীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী সাবরিনা বেগমের মেয়ে ফাতেমার বয়স চার মাস। তিনি বলেন, ‘মেয়ের নিউমোনিয়া টিকার প্রথম ডোজ দিয়েছি। দ্বিতীয় ডোজের টিকার সময় হলেও আট হাসপাতাল ঘুরে টিকা পাইনি। চারদিকে হাম, নিউমোনিয়ায় শিশুমৃত্যুর ঘটনায় অন্যদের মতো শঙ্কিত ছিলাম আমরাও। অবশেষে নির্ধারিত সময়ের ৩৬ দিন পর মেয়েকে টিকা দিলাম।’

দেশে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) টিকার সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় জন্মের পর প্রয়োজনীয় টিকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে হাজার হাজার শিশু। একই সঙ্গে ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনও বারবার পিছিয়ে যাওয়ায় শিশুস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এতে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে শিশুরা। এ অবস্থায় অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় অন্তঃসত্ত্বা নারীরা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানের কাভারেজ কমে যাওয়ায় হাম, নিউমোনিয়া, ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি ও অন্যান্য প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বেড়েছে। এরই মধ্যে দেশে হাম ও হামের উপসর্গে ৬৩৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘শিশুস্বাস্থ্যের বিষয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হয়। এখানে অবহেলার সুযোগ নেই। টিকার মজুত নিশ্চিত করা এবং টিকাদানে আরও সতর্ক হতে হবে। টিকা দেওয়ার জন্য মাইক্রোপ্ল্যানের প্রয়োজন হয়। নিউমোনিয়া, হাম এ টিকাগুলো খুব জরুরি। সঠিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে টিকা দিয়ে হাম নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। নয়তো এ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়বে। নিয়ন্ত্রণে না আনলে নতুন জন্ম নেওয়া শিশুদেরও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মহামারি যেভাবে মোকাবিলা করা হয় সেভাবে কাজ করতে হবে। প্রাইমারি কেয়ার, সেকেন্ডারি এবং আইসিইউ এভাবে স্তরবিন্যাস করে সেবা দিতে হবে। কমিউনিটি পর্যায়ে অপুষ্টির শিকার শিশুদের শনাক্ত করে আইসোলেশন করতে হবে। নয়তো দেখা যাচ্ছে একদিকে টিকা দিচ্ছে, আরেক দিকে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে।’ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যবহৃত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহে জটিলতা তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও টিকার মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে শিশুদের টিকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে জন্মের পরপরই যেসব টিকা নেওয়া জরুরি, সেগুলোর অনেকটিই বিলম্বিত হচ্ছে।

ইপিআই কর্মসূচি অনুযায়ী, জন্মের পর থেকে ১৫ মাস বয়স পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে শিশুকে বিসিজি, পেন্টাভ্যালেন্ট, পিসিভি, পোলিও, এমআরসহ (হাম-রুবেলা) একাধিক টিকা দেওয়া হয়। এসব টিকার কোনোটি সময়মতো না পেলে শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। রাজধানীর কয়েকটি মাতৃসদন হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনেক অভিভাবক টিকার জন্য একাধিকবার এসে ফিরে যাচ্ছেন। স্বাস্থ্যকর্মীরা তাদের পরে আসতে বলছেন। এতে শিশুদের নির্ধারিত টিকা গ্রহণের সময়সূচি ভেস্তে যাচ্ছে।

সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা মিরপুরের গৃহিণী নাসরিন আক্তার বলেন, ‘প্রথম সন্তানের সব টিকা সময়মতো হয়েছে। কিন্তু এখন যেভাবে টিকার সংকটের কথা শুনছি, তাতে দ্বিতীয় সন্তানকে সময়মতো টিকা দিতে পারব কি না তা নিয়ে চিন্তায় আছি।’ বিশেষজ্ঞদের মতে হাম বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি। একটি শিশু আক্রান্ত হলে আশপাশের প্রায় সব অনিরাপদ শিশু সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। হাম প্রতিরোধে উচ্চমাত্রার টিকাদান কাভারেজ প্রয়োজন। কিন্তু টিকাদান ব্যাহত হলে দ্রুত প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি, অন্ধত্ব এবং মস্তিষ্কের জটিলতা দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। দেশে সাম্প্রতিক সময়ে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে টিকাদানের ঘাটতি অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন তাঁরা। শুধু হাম নয়, অন্যান্য টিকার ঘাটতি দেখা দিলে শিশুদের নিউমোনিয়া, মেনিনজাইটিস ও রক্তের সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ে। চিকিৎসকরা বলছেন, পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ এখনো নিউমোনিয়া। টিকার মাধ্যমে এ রোগের একটি বড় অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে টিকা কার্যক্রমে সামান্য বিঘ্নও কয়েক বছর পর বড় ধরনের জনস্বাস্থ্যসংকটে রূপ নিতে পারে। কারণ টিকা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা বাড়তে থাকলে সংক্রমণের জন্য একটি বড় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী তৈরি হয়। শিশুদের রাতকানা, দৃষ্টিশক্তি সমস্যা দূরীকরণ ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বছরে দুবার জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে কোটি কোটি শিশুকে এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। কিন্তু ক্যাম্পেইন বিলম্বিত হওয়ায় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে ভিটামিন ‘এ’র ঘাটতি সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে হাম বা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলে জটিলতা ও মৃত্যুর আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়। টিকার সংকটের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অন্তঃসত্ত্বা নারীরা। সন্তান জন্মের পর নিয়মিত টিকা পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গর্ভাবস্থায় মায়ের পুষ্টি, নিরাপদ প্রসব এবং জন্মের পরপরই শিশুর টিকাদান এ তিনটি বিষয় শিশুর সুস্থ ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর যেকোনো একটি ব্যাহত হলে দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights