শতকোটি টাকার গোপন সম্পদ সাকিবের

নিজস্ব প্রতিবেদক

তারকা ক্রিকেটার এবং আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য সাকিব আল হাসানের কর ফাঁকির অভিযোগ অনুসন্ধানে নতুন করে তৎপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এক বছরের বেশি স্থবির থাকা এ অনুসন্ধানে শতকোটি টাকার বেশি অপ্রদর্শিত সম্পদের তথ্য পেয়েছেন এনবিআরের আয়কর গোয়েন্দারা। এর মধ্যে দেশে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, ওয়েস্ট ইন্ডিজসহ বিভিন্ন দেশে তাঁর সম্পদ থাকার তথ্য মিলেছে। এসব সম্পদের উৎস ও বিপরীতে যথাযথ আয়কর দেওয়া হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এনবিআরের অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট তথ্যানুযায়ী, রাজধানীর গুলশান লেকপাড়ের একটি ভবনে সাকিবের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে; যার বাজারমূল্য অন্তত ২০ কোটি টাকা। তবে এ সম্পদের তথ্য তাঁর আয়কর নথিতে উল্লেখ করা হয়নি। তা ছাড়া শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের তথ্যেও বড় ধরনের অসংগতি পেয়েছেন কর গোয়েন্দারা। এর মধ্যে ২০২৩-২৪ করবর্ষে সাকিব আয়কর নথিতে শেয়ারবাজারে প্রায় ৫৫ কোটি টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন। অথচ সাতটি সিকিউরিটিজ কোম্পানির তথ্য বিশ্লেষণ করে এর পরিমাণ ৬৬ কোটি টাকার বেশি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ প্রায় ১১ কোটি টাকার বিনিয়োগ অপ্রদর্শিত থাকার তথ্য মিলেছে। এ ছাড়া একই করবর্ষে শেয়ারবাজারে কেনাবেচায় প্রায় ২০ কোটি টাকা লোকসান হলেও তা আয়কর নথিতে উল্লেখ করা হয়নি। অন্যদিকে প্রায় ১৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা মুনাফা দেখানো হলেও এর পক্ষে উপযুক্ত প্রমাণ মেলেনি। আগের করবর্ষগুলোতেও একই ধরনের অসংগতি পাওয়া গেছে। এর বাইরে ২০২২-২৩ করবর্ষে শেয়ারবাজারে প্রায় ৪১ কোটি টাকার বিনিয়োগ গোপন করার তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। ওই বছর প্রকৃত মুনাফা প্রায় ১৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা হলেও আয়কর নথিতে দেখানো হয়েছে ১৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৪ কোটি টাকা বেশি মুনাফা দেখানো হয়েছে। ২০২১-২২ করবর্ষেও প্রায় ৯ কোটি টাকার বিনিয়োগ অপ্রদর্শিত থাকার তথ্য মিলেছে। এ ছাড়া ২১ কোটি টাকার স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) বিপরীতে বছরে ১০ লাখ টাকারও কম সুদ দেখানো হয়েছে। সাকিব তাঁর মা শিরিন আক্তারের কাছ থেকে প্রায় ৯ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন বলেও আয়কর নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তবে এ অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন হয়নি বলে অভিযোগ তদন্তসংশ্লিষ্টদের। বিদেশি আয় ও সম্পদের তথ্যেও অসংগতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিন করবর্ষে বিদেশ থেকে প্রায় ২৫ কোটি টাকা আয় দেখিয়েছেন সাকিব। তবে এ আয় করযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও করমুক্ত সুবিধা নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে অনুসন্ধান চলছে। এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ফ্ল্যাট থাকার নির্ভরযোগ্য তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। এ ছাড়া ওয়েস্ট ইন্ডিজসহ আরও কয়েকটি দেশে তাঁর সম্পদ থাকার তথ্য মিলেছে। এসব সম্পদের মালিকানা, অর্থের উৎস ও কর পরিশোধের বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে।

সাকিবের ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়েও চলমান অনুসন্ধানে রাজধানীর মতিঝিলের আরামবাগে তাঁর একটি কার্যালয়ের সন্ধান পাওয়া গেছে। সেই ঠিকানায় ৯টি কোম্পানির নিবন্ধন নেওয়া হয়েছিল। এর বাইরে আরও অন্তত এক ডজন কোম্পানির অস্তিত্ব পেয়েছেন কর গোয়েন্দারা। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকানা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং সাকিবের সঙ্গে আর্থিক সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা হচ্ছে। নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘সাকিবের দীর্ঘ সফল ক্রিকেট ক্যারিয়ার, বিজ্ঞাপন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম থেকে বিপুল আয় করা অস্বাভাবিক নয়। তবে এসব আয়ের বিপরীতে সম্পদের সঠিক বিবরণ দেওয়া এবং আইন অনুযায়ী কর পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক। দেশে কর ফাঁকি ও সম্পদ গোপন করার সুযোগ তৈরির অন্যতম কারণ সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যভান্ডারের মধ্যে সমন্বয়হীনতা।’ আয়কর, জমি ও ফ্ল্যাটের নিবন্ধন, শেয়ারবাজার, ব্যাংক হিসাব এবং কোম্পানির মালিকানাসংক্রান্ত তথ্য সমন্বিতভাবে সংরক্ষিত না থাকায় প্রকৃত সম্পদের হিসাব নিরূপণ কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তথ্যভান্ডার সমন্বয়ের পাশাপাশি ব্লকচেইন বিশ্লেষণ, মেশিন লার্নিং এবং ঝুঁকিভিত্তিক কর নিরীক্ষা চালু করলে অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধি ও সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করা সহজ হবে। জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সাকিবের কর ফাঁকির অভিযোগ অনুসন্ধানে নামে এনবিআর। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় যোগাযোগ হয়। একপর্যায়ে যৌক্তিক কর পরিশোধে সাকিব রাজি হয়েছিলেন বলে অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে শেষ মুহূর্তে সমঝোতা ভেস্তে যায়। এরপর সরকারের সবুজ সংকেত না পাওয়ায় কর আদায়ের প্রক্রিয়া আর এগোয়নি। ফলে এক বছরের বেশি কার্যত থমকে ছিল অনুসন্ধান। এখন নতুন করে পাওয়া দেশিবিদেশি সম্পদের তথ্য যাচাই করে সাকিবের প্রকৃত সম্পদ, আয় ও কর দায় নির্ধারণের চেষ্টা করছেন আয়কর গোয়েন্দারা। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সাকিবের বক্তব্য নেওয়া এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, ব্যক্তি পরিচয় বা রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনা না করে প্রাপ্ত তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights