সংকটে নির্মাণশিল্প

আজহার মাহমুদ, চট্টগ্রাম

রাজনৈতিক পট পরিবর্তন, চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, পর্যাপ্ত এলসি না পাওয়ার কারণে দেশের নির্মাণ শিল্প গভীর সংকট মোকাবিলা করছে। নির্মাণ কাজ কমে যাওয়ায় ইস্পাত কোম্পানিগুলো লোকসান দিয়ে রড বিক্রি করছে। সরকারি প্রকল্প ছাড়াও, অনেক বেসরকারি অবকাঠামো- এমনকি ব্যক্তিগত বাড়িঘর নির্মাণের পরিমাণও কমে গেছে। ফলে নির্মাণ শিল্প সংশ্লিষ্ট লিংকেজ শিল্পগুলোও রুগ্নদশা মোকাবিলা করছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বেশ কিছু চলমান প্রকল্পের কাজ নানা কারণে বন্ধ হয়ে যায়। আবার যেসব সরকারি প্রকল্পে আওয়ামী ঘনিষ্ঠ ঠিকাদাররা কাজ করতেন তাদের অনেকে কাজ রেখে পালিয়ে গেছেন। দলীয় পরিচয় ছাড়া যেসব ঠিকাদার কাজ করতেন তাদের প্রকল্পে নতুন নতুন চাঁদাবাজদের উৎপাত বাড়ায় কাজ বন্ধ করে রেখেছেন ঠিকাদাররা। কোনো কোনো ঠিকাদার বিএনপি-জামায়াতপন্থি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে কাজ হস্তান্তর করে দিয়েছেন।

চলতি বছরের শুরু থেকে কক্সবাজারের কলাতলীতে একটি চারতারকা হোটেলের কাজ করছিলেন ব্যবসায়ী ফরহাদ সুমন। গত আগস্টের পর আর্থিক খাতের চরম দুর্দশা সামনে আসার পর ব্যাংকে নগদ টাকা না পেয়ে বাধ্য হয়ে তিনি নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মালামাল, শ্রমিকের বেতনসহ আনুষঙ্গিক খরচসহ প্রতিদিন গড়ে ৩-৪ লাখ টাকা খরচ হয়। কিন্তু আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ব্যাংকে গিয়ে ৫-১০ হাজার টাকার বেশি পাওয়া যায়নি। এরপর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও যে টাকা দিচ্ছে সেগুলো দিয়ে কাজ চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না।’

আগস্টের আগে থেকে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার চার ইউনিয়নে একটি সরকারি প্রকল্পের দুই শতাধিক শৌচাগার নির্মাণ কাজ করছিল একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু পট পরিবর্তনের পর স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতা তাকে নানাভাবে হয়রানি করতে থাকে। নির্মাণকাজে ব্যবহৃত মালামাল আটকে রেখে চাঁদা দাবি করে। পরে তিনি স্থানীয় অন্য রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যস্থতায় হয়রানি থেকে সাময়িক মুক্তি পান। ভুক্তভোগী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রথমে ওরা চাঁদা চেয়েছে। চাঁদা না দেওয়ায় তারা প্রকল্পে গিয়ে ভাঙচুর করেছে। মালামাল নিয়ে গেছে। পরে সিনিয়র কিছু নেতার মধ্যস্থতায় নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত মালামালগুলো অন্য জায়গায় সরিয়ে আনলেও স্বাভাবিকভাবে কাজ করা যাচ্ছে না।’

চট্টগ্রাম শহরের একজন ঠিকাদার নামকরা একটি গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণের কাজ করছিলেন নারায়ণগঞ্জে। সরকার পরিবর্তনের পর থেকে আওয়ামী ঘনিষ্ঠ এই ঠিকাদার চলাফেরা সীমিত করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘সরকার পরিবর্তনের পর থেকে স্থানীয় কিছু বিএনপি নেতা প্রথমে চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দেওয়ায় কাজ বন্ধ রাখতে বলে। অথবা তাদেরকে কাজটি দিয়ে দিতে বলে। বাধ্য হয়ে কাজ বন্ধ রেখেছি।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শীত মৌসুমে মফস্বল এলাকায় ব্যক্তিগত বাড়িঘর নির্মাণের পরিমাণ বেশি হলেও রড ছাড়া অন্যান্য নির্মাণ সামগ্রীর বাড়তি দামের কারণে বাড়িঘর নির্মাণের পরিমাণও কমে গেছে। পাশপাশি রাজনৈতিক দলের কর্মীদের চাঁদা দাবি, জোরপূর্বক মালামাল সরবরাহের কার্যাদেশ নিতে চাওয়া, আওয়ামী সমর্থক ইটভাটামালিকদের উৎপাদন বন্ধ রাখার কারণেও গ্রামাঞ্চলে নির্মাণ কাজের পরিমাণ কমে গেছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

এদিকে সরকারি ও বেসরকারি নির্মাণ কাজ কমে যাওয়ায় দেশের ইস্পাত শিল্পের দুর্দিন চলছে। ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে রড বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। কিন্তু এরপরও রড বিক্রির পরিমাণ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রডের দাম কম হলেও নির্মাণ শিল্পের অন্যান্য কাঁচামালের দাম বেড়ে গেছে। ডলারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, নিয়ন্ত্রণহীন মূল্যস্ফীতি, নগদ টাকার সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে এমন হচ্ছে। এ ছাড়া ব্যাংকগুলো পর্যাপ্ত এলসি না দেওয়ায় আমদানিকারকরা চাইলেও সিরামিক, ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীসহ নির্মাণ শিল্পের অন্যান্য কাঁচামাল আমদানি করতে পারছেন না। যেগুলো আমদানি হচ্ছে সেগুলোর বাড়তি দাম পড়ে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights