সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া হামের বিস্তার রোধ করা সম্ভব নয়

ডা. লেলিন চৌধুরী

বাংলাদেশে একসময় হাম প্রায় নির্মূলের পথে ছিল। সরকারের লক্ষ্য ছিল ২০২৬ সালের মধ্যে এই রোগের প্রাদুর্ভাব শূন্যে নামিয়ে আনা। কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতা সেই আশাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বর্তমানে দেশে হামের বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে মহামারিসদৃশ পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

যে রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কথা আমরা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম, সেই হাম আবারও শিশুদের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। সরকারি হিসাবে ২৭ দিনে প্রায় দেড় শ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যদিও বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে।

এই পরিস্থিতির পেছনে অন্যতম কারণ টিকাদানের হার হ্রাস পাওয়া। একসময় যেখানে ৯৭-৯৮ শতাংশ শিশু টিকার আওতায় ছিল, সেখানে তা কমে ৬০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ফলে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা গোষ্ঠীগত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়েছে, যা হামের দ্রুত বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে।

হাম কী ও কেন বিপজ্জনক:

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা আরএনএ ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট। একজন আক্রান্ত শিশু থেকে গড়ে ১৬ থেকে ১৮ জন পর্যন্ত শিশু আক্রান্ত হতে পারে। রোগটির প্রধান লক্ষণ হলো জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া বা চোখ দিয়ে পানি পড়া। এর সঙ্গে ডায়রিয়া বা সর্দিকাশিও দেখা দিতে পারে।

যেসব শিশু আগে টিকা নেয়নি, তাদের ক্ষেত্রে জটিলতা মারাত্মক হতে পারে। প্রধান জটিলতার মধ্যে রয়েছে নিউমোনিয়া (ফুসফুসের প্রদাহ) এবং এনকেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ)। এসব জটিলতাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সংক্রমণের পথ:

হাম অত্যন্ত দ্রুত ছড়ায় এবং মূলত তিনটি উপায়ে সংক্রমিত হয়। প্রথমত, আক্রান্ত শিশুর হাঁচি-কাশির মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাস শ্বাসের সঙ্গে অন্যের শরীরে প্রবেশ করে। দ্বিতীয়ত, আক্রান্ত শিশু নাক বা মুখ স্পর্শ করার পর অন্য কোথাও হাত দিলে সেই স্পর্শের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়াতে পারে। তৃতীয়ত, আক্রান্ত শিশুর ব্যবহৃত কাপড়, খেলনা, প্লেট বা গ্লাসের মতো জিনিস ব্যবহারের মাধ্যমেও সংক্রমণ ঘটতে পারে, বিশেষ করে দু-এক ঘণ্টার মধ্যে।

শিশুর সুরক্ষায় করণীয়:

হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান। এর মাধ্যমে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়, যা কার্যকর হতে সাধারণত কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে। এর পাশাপাশি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আক্রান্ত শিশুকে দ্রুত আলাদা করে রাখতে হবে, যাতে অন্যদের সংস্পর্শে না আসে। শিশুর পরিচর্যায় নিয়োজিত ব্যক্তিকে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। শিশুকে পর্যাপ্ত তরল খাবার দিতে হবে, যাতে পানিশূন্যতা না হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা জরুরি।

যদি কোনো শিশুর জ্বর, কাশি, সর্দি বা চোখ লাল হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা যায়, তবে তাকে স্কুলে পাঠানো উচিত নয়। আর স্কুলে এমন লক্ষণ দেখা দিলে কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত শিশুটিকে বাড়িতে পাঠানো এবং আলাদা রাখার ব্যবস্থা করা।

চিকিৎসা সম্পর্কে বাস্তবতা:

হাম একটি ‘নোটিফায়েবল ডিজিজ’, অর্থাৎ এ রোগ শনাক্ত হলে তা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে জানানো বাধ্যতামূলক। এটি একটি সংক্রামক রোগ হওয়ায় দ্রুত তথ্য জানানো হলে রোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হামের নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক ওষুধ নেই। মূলত উপসর্গভিত্তিক জ্বর, কাশি বা অন্যান্য সমস্যা কমানোর জন্য ওষুধ দেওয়া হয়। বেশির ভাগ শিশু যথাযথ যত্নে সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে জটিলতা দেখা দিলে, বিশেষ করে নিউমোনিয়া বা এনকেফালাইটিস হলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে রাখতে হয়।

সরকার ও সমাজের করণীয়:

দীর্ঘদিন হাম না থাকায় অনেক চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর বাস্তব অভিজ্ঞতা কমে গেছে। তাই তাঁদের নতুন করে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা জোরদার করা জরুরি। অভিভাবকদেরও দায়িত্ব রয়েছে সরকারি টিকাদান কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া এবং শিশুদের সময়মতো টিকা নিশ্চিত করা।

বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের সতর্কবার্তা দিচ্ছে টিকাদানে শৈথিল্য বা অবহেলা বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্র—সব পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া হামের বিস্তার রোধ করা সম্ভব নয়।

লেখক : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights