সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দোকানির মালপত্র চুরির অভিযোগ

জবি প্রতিনিধি

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা টিএসসিতে একটি ভাতের দোকান থেকে ৬০ হাজার টাকার মালপত্র চুরি ও জোরপূর্বক দোকান তুলে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ১৬ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ও দৈনিক ইনকিলাবের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ওবায়দুল ইসলামের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় সংবাদ প্রকাশ করায় এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে থানায় জিডিও করেছেন অভিযুক্ত এই সাংবাদিক।

জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনের খালি জায়গায় ব্যবসা করছেন কয়েকজন চায়ের দোকানদার ও ভাত বিক্রেতা। এই স্থানটিকে টিএসসি নামে ডেকে থাকেন শিক্ষার্থীরা। টিএসসির মাঝের অংশে কয়েকবছর ধরে ভাতের দোকান চালান রফিক মোল্লা। শিক্ষার্থীদের কাছে মোল্লা মামা নামেই অধিক পরিচিত তিনি। দুপুরে ক্লাস-পরীক্ষার ফাঁকে মোল্লা মামার ভাতের দোকানে আহারের কাজটি সেড়ে নেন তারা। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ ধরে মোল্লা মামার দোকানটি তুলে নিতে হুমকি দিয়ে আসছিলেন অভিযুক্ত ওবায়দুল ইসলাম। গত শুক্রবার (২২ নভেম্বর) মোল্লার দোকান থেকে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রসহ দোকানের খুঁটিনাটি জিনিসও চুরি হয়ে যায়। টিএসসির অপর একটি দোকানের দুই কর্মচারীর মাধ্যমে প্রায় ৬০ হাজার টাকা মূল্যের আসবাবপত্র অভিযুক্ত ওবায়দুল ইসলাম সরিয়ে নেন বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজনের সাথে কথা বলে অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে। দোকান সরিয়ে জায়গা দখলে নিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্যের নাম ভাঙানো হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমেও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

সরজমিনে দেখা যায়, টিএসসিতে রফিক মোল্লার দোকানের জায়গায় নতুন একটি দোকান ঘর তোলা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বাঁশের বেড়া দিয়ে জায়গাটি ঘেরাওয়ের কাজ চলছে।

ভুক্তভোগী রফিক মোল্লা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুই সপ্তাহ আগে অভিযুক্ত ওবায়দুল ইসলাম ওরফে উবায় টিএসসিতে এসে তার দোকান সরিয়ে নিতে বলেন। পরে রফিক আপত্তি জানালে ওবায়দুল ইসলাম জানান সে বাখরখানির দোকান দিবে তাই রফিক মোল্লাকে টিএসসি থেকে এই দোকান সরাতে হবে। এর কিছুদিন পর আহমেদ নামে এক শিক্ষার্থী এসে রফিক মোল্লাকে দোকান সরাতে হুমকি দেন। আহমদ নামের ওই শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দোকান সরাতে বলেছে বলেও মোল্লাকে হুমকি দেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা আরো জানান, শুক্রবার দোকানে এসে কর্মচারীরা দেখেন দোকানে আসবাবপত্রসহ মালপত্র কিছুই নেই, সব চুরি হয়ে গেছে। এরপর আজ শনিবার ( ২৩ নভেম্বর) সকালে আবার দোকান বসান মোল্লা । এরকিছু সময় পর খাবারের ভ্যান আসলে ওবায়দুলসহ কয়েকজন এসে ভ্যান ফেরত পাঠিয়ে দেয়। এসময় রফিক মোল্লার দোকানের কর্মচারীর ফোন কেড়ে নেন তারা।

রফিক মোল্লা বলেন, দুই সপ্তাহ আগে ওবায়দুল ইসলাম আমার দোকানে এসে বলে, তোমার দোকান সরাও আমি দোকান দিবো। আমি তাকে বলি, আমার দোকান সরালে আমি পরিবার নিয়ে কিভাবে চলবো, আমার পেটে লাথি দিয়ে দোকান কেন দিবেন? দোকানে অনেক কাস্টমারের বাকিও আছে। তখন সে বলে, তোমার দোকান সরাইতেই হবে, আমি এখানে বাকরখানির দোকান দিবো। এরপর সেদিনের মতো চলে গিয়ে আবার কিছুদিন পর সাথে দুইতিনটা ছেলে এনে দোকান ছাড়তে চাপ দেয়। আমি দোকান না সরালে গত পরশুদিন ফোন করে দোকান ছাড়তে থ্রেট দেয়।

তিনি আরও বলেন, এরপরে শুক্রবার দোকান চালু করতে এসে দেখি দোকানে কোনো মাল নেই। দোকানের আসবাবপত্র, সিলিন্ডার মেশিনসহ প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকার মালামাল চুরি করে নিয়ে গেছে। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি ইমনের দোকানের স্টাফ মিন্টু আর বিল্লালকে দিয়ে ওবায়দুল মালামাল চুরি করায়। এরপর থেকে আমাকে তারা দোকানে ঢুকতে দিচ্ছেনা, চটা দিয়ে বেড়া দিয়ে রেখেছে। মাঝে তাদের একটা ছেলে এসে এটাও বলেছে ভিসি স্যার থেকে অনুমতি নিয়ে এসেছি, দোকান তোমাকে সরাতেই হবে।

টিএসসির দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আন্দোলনের আগে শাখা ছাত্রলীগ এখান থেকে নিয়মিত চাঁদা উত্তোলন করতো। আন্দোলনের পর এখন অনেকেই সমন্বয়ক ও ছাত্রদল পরিচয়ে হাম্বি-তম্বি করে। কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে অভিযুক্ত ওবায়দুল দোকান দেওয়াকে কেন্দ্র করে মোল্লাকে হুমকি দিয়ে আসছে। মাঝে টিএসসির সামনের অংশে খাতা-কলম বিক্রেতা মনিরকেও হুমকি-ধামকি দেয় দোকান তুলে নিতে বলে। এসময় মনিরের দোকানেও ভাঙচুর চালায় সে।

এবিষয়ে ভুক্তভোগী মনির বলেন, তারা পরে এসে ভুল স্বীকার করেছে। সমাধান হয়ে গেছে। এটা নিয়ে আর কিছু বলতে চাইনা। আমার তো এখানে দোকান দিয়ে খেতে হবে।

এবিষয়ে নিউজ প্রকাশ করায় দুই সাংবাদিককে চাপ প্রয়োগেরও অভিযোগ উঠেছে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে। অনলাইন পোর্টাল দেশদশের মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিক মিনহাজুল ইসলাম বলেন, নিউজ করার পর আমার কাছে বিভিন্ন জায়গা থেকে ফোন এসেছে। যেনো নিউজ না করি। অনেকগুলো ফোন আসার পর আমি আর ফোন ধরিনি।

এবিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত ওবায়দুল ইসলাম বলেন, আমার নামে ৬০ হাজার টাকার মালামাল চুরির অভিযোগ উঠেছে। এটা সত্য নয়। আমার মালামাল দোকানে ছিলো। রফিক মোল্লা আমাকে দোকানের মালামালগুলো সরিয়ে নিতে অথবা ফেলে দিতে বলে। তখন আমি লোক দিয়ে মালামালগুলো সরিয়ে নেই। আর রফিকের কর্মচারীদের আমি মারধর করিনি, একটু ধাক্কাধাক্কি হয়েছে।

দোকান দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে অনেকেই দোকান দখল করে আছে। সবাই দখল করে দোকান দিয়েছে। সেগুলোর খোঁজ নিয়ে জানেন। আপনারা ওগুলো নিয়ে তো নিউজ করেননা। আমিও সাংবাদিকতা করি। আমার কাছেও কিছু তথ্য আছে।

এবিষয়ে বক্তব্য নিতে ছাত্রদল নেতা কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিতকে ফোন করা হলেও নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।

এব্যাপারে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি আসাদুজ্জামান আসলাম বলেন, বিষয়টি শুনেছি। এর আগেও শুনেছি সে জগন্নাথের একটা হলে উঠেছে এই পরিচয় দিয়ে। সে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে হয়তো এসব করেছে। সে ছাত্রদলের কর্মী না। তাই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি আসছে না। তবুও সে যে ছাত্রদলের কর্মী না এটা আমরা বিবৃতি দিয়ে ক্লিয়ার করে দিবো।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. তাজাম্মুল হক বলেন, কি ধরনের অসৎ মানুষ হলে এগুলো করা তার পক্ষে সম্ভব। উপাচার্য তথা প্রশাসনকেও যদি এসব চুরি চামারির ভেতরে ঢুকিয়ে ফেলে। চল্লিশ বছরে যা অর্জন করেছি সব তো এরা ডুবিয়ে ফেলছে। এটা সিরিয়াসলি দেখা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ শাখার পরিচালক মুহাম্মদ আনওয়ারুস সালাম বলেন, এটি সিরিয়াস একটি বিষয়। আমি বিষয়টি শুনেছি, কিন্তু বিস্তারিত জানিনা। আমাকে লিখিত অভিযোগ দিলে আমি পদক্ষেপ নিবো।

উপাচার্যের নাম ব্যবহারের বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম বলেন, তারা আমার নাম ব্যবহার করে এসব কেন করবে? তারা একদম ঠিক কাজ করছে না। তোমরা প্রক্টরকে এগুলো জানাবে। আজ তো ছুটির দিন, আমি আগামীকাল বিষয়টি দেখবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights