সাগরে মুখোমুখি চীন-যুক্তরাষ্ট্র

অনলাইন ডেস্ক

বিরোধপূর্ণ দক্ষিণ চীন সাগরে একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করেছে, এমন দাবি তুলে সেখানে দ্রুত নিজেদের নৌবাহিনী ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে চীন। বেইজিংয়ের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধপূর্ণ প্রবালদ্বীপ (সাবিনা শোয়াল)-এর কাছে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস চার্লসটন’ অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করায় আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। একই দিনে ওই এলাকার আরও উত্তরে তাইওয়ান-নিয়ন্ত্রিত প্রাতাস দ্বীপপুঞ্জের কাছে একটি চীনা কোস্টগার্ড জাহাজের অনুপ্রবেশকে কেন্দ্র করে নতুন করে চরম মুখোমুখি অবস্থান ও বাদানুবাদ হয়েছে।

মঙ্গলবার ভোরে স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জের সাবিনা শোয়ালের নিকটবর্তী জলসীমায় মার্কিন এই যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি টের পায় চীনের সামরিক বাহিনীর নর্দার্ন ও সাউদার্ন থিয়েটার কমান্ড। চীনা সামরিক বাহিনীর সাউদার্ন থিয়েটার কমান্ড এক বিবৃতিতে কড়া প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে, চীনা সরকারের কোনো পূর্ব অনুমতি ছাড়াই ‘ইউএসএস চার্লসটন’ সেখানে বেআইনিভাবে ঢুকে পড়ে। চীনের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ চীনের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে, সমুদ্রপথের নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলেছে এবং অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করেছে। বেইজিং অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্রকে এই ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে এবং সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও মার্কিন জাহাজটির গতিবিধি ট্র্যাকিংয়ের জন্য নিজেদের শক্তিশালী নৌবহর ও সেনাদল মোতায়েন নিশ্চিত করেছে।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মার্কিন নৌবাহিনী এসব পদক্ষেপকে সাধারণত ‘ফ্রিডম অব নেভিগেশন’ বা মুক্ত নৌচলাচল অভিযান হিসেবে অভিহিত করে থাকে। মার্কিন নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য না পাওয়া গেলেও, দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের এমন অভিযান পরিচালনার ইতিহাস বেশ পুরনো। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়ে ফিলিপাইনের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র এক বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, মার্কিন জাহাজটি চীন সরকারের কোনো ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করেনি। ফিলিপাইন সামরিক বাহিনীর মতে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় আইনানুগ যাতায়াত ও চলাচলের জন্য কোনো দেশের আগাম অনুমতি নেওয়ার অধিকার বা কর্তৃত্ব আন্তর্জাতিক নিয়মে কারোরই নেই। সাবিনা শোয়াল এবং পুরো স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জ এলাকার মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চীন ও ফিলিপাইনের মধ্যে তীব্র বিরোধ চলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইনের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকায় এই অঞ্চলের সংঘাত বিশ্বরাজনীতিতে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। মাত্র এক মাস আগেই একই স্থানে একটি ফিলিপাইনি জ্বালানিবাহী নৌযানকে লক্ষ্য করে চীন কোস্টগার্ডের একটি জাহাজ মুখোমুখি ধাক্কা বা রামিংয়ের ঘটনা ঘটায়। সেসময় সংঘর্ষের জন্য উভয় দেশই একে অপরকে দায়ী করেছিল।

অন্যদিকে, ঠিক একই দিনে দক্ষিণ চীন সাগরের উত্তরভাগে অবস্থিত তাইওয়ান-নিয়ন্ত্রিত প্রাতাস দ্বীপপুঞ্জের কাছে পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নেয়। তাইওয়ানের কোস্টগার্ড আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, একটি চীনা কোস্টগার্ড জাহাজ প্রাতাস দ্বীপপুঞ্জের তাদের সংরক্ষিত বা বিতর্কিত এলাকায় অনধিকার প্রবেশ করে। অনুপ্রবেশকারী এই চীনা জাহাজটিকে তাড়াতে তাইওয়ানের ‘তাইচুং’ নামের একটি কোস্টগার্ড জাহাজ তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে রওনা হয় এবং রেডিও বার্তায় উভয় পক্ষই একে অপরকে লক্ষ্য করে মৌখিক সতর্কবার্তা দেওয়া শুরু করে।

ঘটনাস্থলে দুই পক্ষের রেডিও বাকযুদ্ধে তাইওয়ানের পরিচয় নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। চীনা জাহাজটি রেডিওবার্তায় প্রচার করতে থাকে যে, বিশ্ব মানচিত্রে তথাকথিত ‘রিপাবলিক অব চায়না’ বা তাইওয়ানের আনুষ্ঠানিক নামের কোনো অস্তিত্বই নেই। পাল্টা প্রত্যুত্তরে তাইওয়ানি জাহাজের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়, ‘রিপাবলিক অব চায়না, তাইওয়ান একটি সার্বভৌম এবং পুরোপুরি স্বাধীন রাষ্ট্র।’ তাইওয়ানের কোস্টগার্ড সূত্রে জানা গেছে, সমুদ্রে দুই দেশের জাহাজের এই উত্তপ্ত মুখোমুখি অবস্থান দীর্ঘ সময় ধরে অব্যাহত ছিল। এই ঘটনার বিষয়ে চীনের তাইওয়ানবিষয়ক কার্যালয় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে গত সপ্তাহেই প্রাতাস দ্বীপপুঞ্জের কাছে চীনা একটি মাছ ধরার নৌকায় তাইওয়ান কোস্টগার্ড ওয়াটার কামান বা জলকামান ব্যবহার করায়, এর পরিণতি তাইওয়ানকে ভোগ করতে হবে বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিল চীন।

সূত্র: রয়টার্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights