সাবধান, সুশীলরা আবারও মাঠে নেমেছে
অদিতি করিম
বাংলাদেশের সুশীল সমাজকে নিয়ে আমাদের অনেক ভয়। তারা জাতির বিবেক। কিন্তু সব সময় তাদের বিবেক জাগ্রত হয় না। তাদের ঘুম ভাঙে হঠাৎই, বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে। তারা যখন কথা বলেন, তখনই সাধারণ মানুষ সর্বনাশের গন্ধ পায়। সাম্প্রতিক সময়েও তেমনই ঘটছে বলে মনে হচ্ছে। বাংলাদেশের সুশীলসমাজের সদস্যরা সম্প্রতি জোটবদ্ধ হয়ে দুটি বিবৃতি দিয়েছেন।
দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক ও পেশিশক্তির প্রভাব খাটিয়ে ভূমি ও বাড়ি দখল, খাসজমি দখল, হামলা ও চাঁদাবাজির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ জানিয়েছেন ৩৮ জন বিশিষ্ট নাগরিক। গত কিছুদিন এসব ঘটনা বেড়েছে উল্লেখ করে তাঁরা বলেছেন, এতে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে।
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন সুলতানা কামাল, আনু মুহাম্মদ, খুশী কবির, শিরীন পারভিন হক, ইফতেখারুজ্জামান, আবু সাঈদ খান, জেড আই খান পান্না, সারা হোসেন, শাহীন আনাম, শহিদুল আলম, স্বপন আদনান, শামসুল হুদা, সামিনা লুৎফা, সুমাইয়া খায়ের, গীতি আরা নাসরীন, জোবাইদা নাসরীন, তাসনিম সিরাজ মাহবুব, নোভা আহমেদ, ফিরদৌস আজিম, রেহনুমা আহমেদ, সাঈদ ফেরদৌস, সুব্রত চৌধুরী, নায়লা খান, মো. নূর খান, পাভেল পার্থ, ঈশিতা দস্তিদার, মনিন্দ্র কুমার নাথ, রোজিনা বেগম, জাকির হোসেন, সাইদুর রহমান, সালেহ আহমেদ, রেজাউল করিম চৌধুরী, শাহেদ কায়েস, মিঠুন রাকসাম, সাঈদ আহমেদ, দীপায়ন খীসা, হানা শামস আহমেদ ও মুক্তাশ্রী চাকমা।
দ্বিতীয় বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন ৩৬ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি। রাজধানীর বাংলাবাজারে প্রকাশনা সংস্থা ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) শোরুমে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই বিক্রি বন্ধের দাবিতে হামলা ও বিক্রয়কর্মীদের হয়রানির ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের ৩৬ জন বিশিষ্ট নাগরিক। এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ও বই বিক্রেতাদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী বিশিষ্ট নাগরিকদের মধ্যে রয়েছেন মানবাধিকারকর্মী হামিদা হোসেন, ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবির, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুব, মোশাহিদা সুলতানা, সামিনা লুৎফা, রুশাদ ফরিদী, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফিরদৌস আজীম, আদিবাসী অধিকার সুরক্ষাকর্মী রাণী ইয়েন ইয়েন, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন ও শরীফ ভূঁইয়া; লেখক ও গবেষক রেহনুমা আহমেদ, অর্থনীতিবিদ জিয়া হাসান, আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল, মানজুর আল মতিন ও প্রিয়া আহসান চৌধুরী, নারী অধিকারকর্মী মাহীন সুলতান, নারীপক্ষের আন্দোলন সম্পাদক গীতা দাস, ভয়েস ফর রিফর্মের ফাহিম মাশরুর, লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ এবং সাংবাদিক সায়দিয়া গুলরুখ প্রমুখ।
দেশে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা উদ্বিগ্ন হতেই পারেন। যেকোনো অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে তাঁরা প্রতিবাদ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু লেখকের মতে, আমাদের সুশীলসমাজ সব অন্যায়ের প্রতিবাদ করে না। সব অনাচার তাদের বিবেককে জাগ্রত করে না।
বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে মাত্র সাত মাস হলো। একটি ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই সরকারের পক্ষে রাতারাতি সবকিছু ঠিকঠাক করা সম্ভব নয়—এমন মত তুলে ধরে লেখক বলেন, ইউনূসের দেড় বছরের শাসনকালে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছিল। সেখান থেকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করা কোনো সরকারের পক্ষেই সহজ নয়।
লেখকের আরও দাবি, একটি মহল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র করছে। এমন অবস্থায় বিচ্ছিন্ন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় সুশীলসমাজের সাম্প্রতিক বিবৃতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে লেখক জানতে চান, এত দিন তাঁরা কোথায় ছিলেন। বিশেষ করে ইউনূসের দেড় বছরের শাসনকালে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবনতি ঘটেছিল, তখন সুশীলসমাজ নীরব ছিল কেন—সে প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
ড. ইউনূসের আমলে মব সন্ত্রাস ও দখলদারির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল বলে দাবি করেছেন লেখক। তাঁর ভাষ্য, গত দেড় বছরে ক্ষমতার জোরে অন্যের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখল করার প্রবণতা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, ড. ইউনূসের সরকার একটি শক্তিশালী মব বাহিনীকে প্রশ্রয় দিয়েছিল, যারা আইনের ঊর্ধ্বে থেকে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারত।
লেখকের মতে, ইউনূসের ১৮ মাসের শাসনকালে রাষ্ট্রীয় মদদে লুটপাট, ঘরবাড়ি দখল ও কলকারখানায় আগুন দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো নিয়েও সুশীলসমাজের কাছ থেকে তেমন কোনো বিবৃতি পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় তাদের উদ্বেগ প্রকাশকে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করেন।
তাঁর মতে, কোনো ধরনের সন্ত্রাস বা অপরাধই কাম্য নয়। তবে ইউনূস সরকারের আমলে সংঘটিত অপরাধের তুলনায় সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো খুবই সামান্য। তাঁর দাবি, ইউনূস আমলে যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছিল, গত সাত মাসে তার তুলনায় উন্নতি হয়েছে। ফলে সুশীলসমাজ কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে সামনে এনে যেভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তা তাঁর কাছে রহস্যজনক মনে হয়েছে।
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই বিক্রিতে বাধা দেওয়ার ঘটনায় ৩৬ জন বিশিষ্ট নাগরিকের বিবৃতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন লেখক। তাঁর ভাষ্য, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ একটি বই হলেও ইউনূস সরকারের সময়ে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে উপর্যুপরি হামলা ও ভাঙচুর, সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ধ্বংসের চেষ্টার অভিযোগের সময় সুশীলসমাজ কেন প্রতিবাদ করেনি—সেই প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন।
লেখকের দাবি, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই সুশীলসমাজের বর্তমান অবস্থানের কথিত রহস্যের একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে।
অতীতের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উদাহরণ টেনে লেখক বলেন, যখনই কোনো নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসে, তখনই সুশীলসমাজের কয়েকজন ব্যক্তি সেই সরকারের সমালোচনায় সোচ্চার হয়ে ওঠেন। তাঁর মতে, ২০০১ সালেও বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সুশীলসমাজের একটি অংশ সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। বিএনপির বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ এনে জনসমক্ষে সরকারকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে সেনাসমর্থিত সরকার ক্ষমতায় আসে বলেও উল্লেখ করেছেন লেখক।
এখন সুশীলসমাজের একটি অংশ আবারও ক্ষমতা দখলের পুরনো খেলায় জড়িয়ে পড়েছে কি না—সেই প্রশ্ন তুলেছেন লেখক। তাঁর মতে, দেশে সংকট সমাধানে যখন ঐক্য ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ প্রয়োজন, তখনই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির অপচেষ্টা চলছে। এমন কিছু বিষয়ে সরকারের সমালোচনা করা হচ্ছে, যেগুলোর জন্য সরকার দায়ী নয় বলে তিনি মনে করেন। বরং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে—এমন দাবিও করেছেন তিনি।
লেখকের মতে, সুশীলসমাজের পক্ষ থেকে এ ধরনের বিবৃতি সন্দেহের উদ্রেক করছে। তাঁর ভাষ্য, দেশে গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত করতে এবং বিরাজনীতিকরণের জন্য কৃত্রিমভাবে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা অতীতেও হয়েছে। তাঁর দাবি, এমন পরিস্থিতি তৈরি করেই ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসেছিল।
বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ২০০৬ সালের শেষ দিকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির তুলনাও করেছেন লেখক। তাঁর মতে, ওই সময় রাজনৈতিক দলগুলোকে মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছিল এবং ক্ষমতার লড়াইয়ে তারা রক্তক্ষয়ী সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েছিল। দেশজুড়ে রাজপথ ও রেলপথ অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচির কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য অচল হয়ে পড়েছিল।
লেখকের দাবি, ওই সময় সুশীলসমাজের একটি অংশ দুই পক্ষের বিরোধ উসকে দেওয়ার জন্য সক্রিয় হয়েছিল। টেলিভিশন ও সংবাদপত্রে প্রকাশিত তাঁদের বিভিন্ন লেখা ও বক্তব্য বিভেদ বাড়িয়েছিল বলেও তিনি মনে করেন। রাজনৈতিক দলগুলোকে সমঝোতার বদলে সংঘাতের পথে প্ররোচিত করে দেশে জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছিল—এমন মতও তুলে ধরেছেন তিনি।
তাঁর মতে, এর সুযোগেই ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে এক-এগারোর সরকার ক্ষমতায় আসে। সেই সরকার ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশে বিরাজনীতিকরণের যে কার্যক্রম শুরু করেছিল, তা থেকে লেখকের ধারণা—২০০৬ সালের শেষ দিকের ঘটনাগুলো পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল। তিনি এটিকে একটি নীলনকশার সুনিপুণ বাস্তবায়ন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এবারও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে কি না এবং সে কারণেই সুশীলসমাজের ঘুম ভেঙেছে কি না—সে প্রশ্নও তুলেছেন লেখক।
সবশেষে লেখক বলেন, সুশীলসমাজ যদি ইউনূস সরকারের সময়কার কথিত অপশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করত, তাহলে তাদের বর্তমান বিবৃতি নিয়ে প্রশ্ন উঠত না। তাঁর মতে, সুশীলসমাজের একটি অংশের কথিত দ্বিমুখী আচরণই উদ্বেগের কারণ। দেশের পরিস্থিতি নিয়ে নয়, বরং সুশীলসমাজের সাম্প্রতিক তৎপরতা নিয়েই মানুষের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সুশীলসমাজের একটি অংশ আবারও কোনো নতুন রাজনৈতিক খেলায় জড়িয়ে পড়েছে কি না—এই প্রশ্ন রেখেই লেখাটি শেষ করেছেন অদিতি করিম।
অদিতি করিম : লেখক ও নাট্যকার
ই-মেইল: auditekarim@gmail.com
