সারের বস্তায় সিন্ডিকেটের থাবা, বিপাকে ফেনীর কৃষক

ফেনী প্রতিনিধি

ফেনীতে সরকারি মূল্যের সার নিয়ে অনিয়ম, কৃত্রিম সংকট ও সিন্ডিকেটের অভিযোগে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, কোথাও অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি, মজুত ও কৃত্রিম সংকটের কারণে বাড়তি দামে সার কিনতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে প্রতিটি সারের বস্তায় বিশেষ কিউআর কোড যুক্ত করে কোন ডিলারের কাছে সার বরাদ্দ হয়েছে, কখন গুদামে ঢুকেছে এবং কোথায় বিক্রি হচ্ছে—তার ডিজিটাল ট্র্যাকিং চালুর দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা। পাশাপাশি ডিলারদের গুদাম ও বিক্রয়কেন্দ্রে নিয়মিত অভিযান এবং অনিয়মে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

জেলার বিভিন্ন উপজেলার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মৌসুমে সারের চাহিদা বাড়ার সুযোগে সরবরাহ ও দামে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অতিরিক্ত দামে বিক্রি, কৃত্রিম সংকট, মজুত এবং নির্ধারিত ক্রেতার বাইরে সার বিক্রির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা। এতে একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে সময়মতো সার না পাওয়ায় ফসল উৎপাদন নিয়েও শঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

দাগনভূঞার বারাহী গোবিন্দপুর গ্রামের কৃষক ফজলুল করিম বলেন, ‘সারের দাম ও প্রাপ্যতা নিয়ে কৃষকদের ভোগান্তি বাড়ছে। সময়মতো ন্যায্যমূল্যে সার না পেলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। এতে কৃষকের লাভ কমে যায়।’

পরশুরামের ধনিকুন্ডা গ্রামের কৃষক মাহমুদুল হক বলেন, ‘সরকারি দামে সার পাওয়ার কথা থাকলেও বাজারে অনেক সময় বাড়তি দামে কিনতে হয়। সারের মজুত ও বিক্রির ওপর কঠোর নজরদারি দরকার।’

সোনাগাজীর চরচান্দিয়া গ্রামের কৃষক বাহাদুর বলেন, ‘মৌসুমের শুরুতেই সারের সরবরাহ নিশ্চিত করা না হলে কৃষকের ক্ষতি হয়। ডিলাররা কত সার পেলেন এবং কতটা বিক্রি করলেন, সেই হিসাব নিয়মিত যাচাই করা উচিত।’

ফুলগাজীর নুরপুর গ্রামের কৃষক আবদুর রশিদ বলেন, ‘কৃষক যাতে সরাসরি সরকারি মূল্যে সার পান, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অনিয়ম হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’

ছাগলনাইয়ার দক্ষিণ সতেরো গ্রামের কৃষক আবু তাহের বলেন, ‘সারের বাজারে সিন্ডিকেট বা কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন ছোট ও প্রান্তিক কৃষক। তাই মাঠপর্যায়ে নিয়মিত অভিযান প্রয়োজন।’

ফেনী সদরের সুন্দরপুর গ্রামের কৃষক আইয়ুব বলেন, ‘সার নিয়ে কোনো অনিয়ম হলে তার প্রভাব সরাসরি ফসল উৎপাদনে পড়ে। কৃষকের স্বার্থে সারের সরবরাহ, দাম ও ডিলারদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।’

কৃষকদের দাবি, অনিয়ম বন্ধে ডিলারদের কার্যক্রমে কঠোর নজরদারি, নিয়মিত অভিযান এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে লাইসেন্স বাতিলসহ আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

কৃষকদের মতে, প্রতিটি সারের বস্তায় কিউআর কোড যুক্ত করে ডিজিটাল ট্র্যাকিং চালু করা হলে কোন বস্তা কোন ডিলারের কাছে বরাদ্দ হয়েছে, কখন গুদামে ঢুকেছে এবং কোথায় বিক্রি হয়েছে—এসব তথ্য সহজেই অনুসরণ করা সম্ভব হবে। এতে সরকারি সারের অবৈধ মজুত, এক ডিলারের সার অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া কিংবা অতিরিক্ত দামে বিক্রির ঘটনা শনাক্ত করা সহজ হবে।

এ ছাড়া ঐতিহ্যবাহী বা প্রভাবশালী বংশানুক্রমিক ডিলারশিপের পরিবর্তে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ায় ডিলার নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা। কোনো ডিলারের খাতা, গুদাম বা বিক্রয়কেন্দ্রে অনিয়ম ধরা পড়লে লাইসেন্স বাতিলের পাশাপাশি প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি রয়েছে।

সার বিতরণ মৌসুমে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে নিয়মিত সারপ্রাইজ ভিজিট ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার দাবিও জানিয়েছেন তারা। বিশেষ করে প্রত্যন্ত বাজারের অবৈধ খুচরা দোকান এবং ডিলারদের গুদামে নিয়মিত অভিযান চালানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন কৃষকরা।

কোনো এলাকায় সরকারি সার কালোবাজারি বা অতিরিক্ত দামে বিক্রির ঘটনা ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট ডিলারের পাশাপাশি তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ও মনিটরিং কমিটির ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবিও উঠেছে।

ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, ‘সারের সরবরাহ ও মূল্য নিয়ে কৃষকদের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সরকারি বরাদ্দের সার যাতে নির্ধারিত মূল্যে প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছায়, সে বিষয়ে প্রশাসনের নজরদারি রয়েছে। অনিয়ম, মজুত বা অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

দীর্ঘমেয়াদে ডিলারদের মাধ্যমে ভর্তুকি দেওয়ার পরিবর্তে ডিজিটাল ‘কৃষক কার্ড’ কিংবা কৃষকের ব্যাংক বা মোবাইল অ্যাকাউন্টে সরাসরি ভর্তুকি পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছেন কৃষকরা। তাদের মতে, এতে সরকারি সহায়তা প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ বাড়বে এবং সরকারি সারের ওপর মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ কমবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights