‘সিটি মডেলে’ জাতীয় নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করাই চ্যালেঞ্জ

সদ্য সমাপ্ত পাঁচ সিটির নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল মোটামুটি সন্তোষজনক। ভোট কেন্দ্র করে বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেনি। বলা যায় সুষ্ঠু পরিবেশে ভোটাররা ভোট দিতে পেরেছেন। বিষয়টি নিয়ে ফুরফুরে মেজাজে ক্ষমতাসীনরা। সিটি নির্বাচনকে মডেল ধরে তারা জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে। দলের নেতারা বলছেন, ভোটারদেরই এই স্বতঃস্ফূর্ততা থাকলে বিএনপি বা কোনো দল নির্বাচনে না এলেও তাতে বিরূপ প্রভাব পড়বে না।

বিশিষ্টজনরা বলছেন, নির্বাচন যদি নিয়মতান্ত্রিকভাবে হয় তাহলে সেটি দেশ-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা পাবে। তাতে কোন দল এলো বা এলো না সেটা বিষয় না। আর কোনো বিশেষ দলকে নির্বাচনে আনাও নির্বাচন কমিশনের কাজ না।

১৫ মে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে মোট ভোটার ছিল ১১ লাখ ৮৯ হাজার ৪৬৩ জন। ভোট দিয়েছেন পাঁচ লাখ ৭৫ হাজার ৫০ জন, যা মোট ভোটের ৪৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ওই নির্বাচনে টেবিল ঘড়ি প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মা জায়েদা খাতুন দুই লাখ ৩৮ হাজার ৯৩৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। নৌকার প্রার্থী আজমত উল্লা খান পরাজিত হন ১৬ হাজার ১৯৭ ভোটে।

বরিশালে নৌকা প্রতীক নিয়ে বেসরকারি ফলাফলে আবুল খায়ের আবদুল্লাহ পেয়েছেন ৮৭ হাজার ৭৫২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হাতপাখা প্রতীক নিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী সৈয়দ মো. ফয়জুল করীম পান ৩৪ হাজার ৩৪৫ ভোট। এই নগরের দুই লাখ ৭৬ হাজার ২৯৭ ভোটারের মধ্যে ৩০টি ওয়ার্ডের ১২৬টি কেন্দ্রে মোট এক লাখ ৪২ হাজার ১৭৭ জন ভোট দিয়েছেন। যা হিসাবে ৫১ শতাংশ।

খুলনার পাঁচ লাখ ৩৫ হাজার ৫২৯ ভোটের মধ্যে তালুকদার খালেক পেয়েছেন এক লাখ ৫৪ হাজার ৮২৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হাতপাখা প্রতীক নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের মো. আব্দুল আউয়াল পেয়েছেন ৬০ হাজার ৬৪ ভোট। খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৪২ থেকে ৪৫ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানান রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন।

রাজশাহী সিটি নির্বাচনে মোট ভোটার তিন লাখ ৫১ হাজার ৯৮২ জন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী এ এইচ এম খায়রুজ্জামান পেয়েছেন এক লাখ ৬০ হাজার ২৯০ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মুরশিদ আলম পেয়েছেন ১৩ হাজার ৪৮৩ ভোট। যদিও মুরশিদ আলম ১২ জুন রাতেই নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এই নির্বাচনে ভোটের হার ৫৬ দশমিক ২০ শতাংশ ছিল।

সিলেটে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী এক লাখ ১৯ হাজার ৯৯১ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম (বাবুল) পান ৫০ হাজার ৮৬২ ভোট। মোট ভোট পড়েছে ৪৬ শতাংশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক জাগো নিউজকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনা করবে। তাদের তফসিল অনুযায়ী রাজনৈতিক দল ও তাদের প্রার্থীরা মনোনয়ন জমা দেবে। নির্বাচন কমিশন আইন অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠান করবে। কোন দল অংশগ্রহণ করবে বা করবে না, এটা নির্বাচন কমিশনের দেখার বিষয় নয়। এটা রাজনৈতিক দলের দেখার বিষয়। সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন হচ্ছে কি না, সেটা জনগণের দেখার বিষয়।’

তিনি বলেন, ‘জনগণ ভোট দিতে যাবে। তারা নির্বিঘ্নে ভোট দিয়ে আসবে। তাদের ভোট স্বচ্ছভাবে গণণা করে ফলাফল প্রচার করা হবে— এটা হচ্ছে নির্বাচনী বিধিমালা এবং নির্বাচনী ব্যাকরণ। এই ব্যাকরণের মধ্য দিয়ে যদি নির্বাচন পরিচালিত হয়, তাহলে সেটির গ্রহণযোগ্যতা শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও গ্রহণযোগ্যতা পাবে।’

‘নির্বাচনে কারা অংশ নেবে, কারা নেবে না- সেই সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের নেওয়ার এখতিয়ার নেই। নির্বাচনের বিষয়ে সরকারেরও কোনো কিছু করার সুযোগ নেই। এই কাঠামোর মধ্যে নির্বাচন পরিচালনা করতে হবে। এতে অংশ নেওয়া বা না নেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নিজস্ব সিদ্ধান্তের বিষয়। অংশগ্রহণকারীদের কেউ যদি মনে করে তাদের প্রার্থিতা সঠিকভাবে নেওয়া হয়েছে, মনোনয়ন সঠিকভাবে হয়েছে, ভোট প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে— তাহলেই নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হবে।’ যোগ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই উপাচার্য।

জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত জাগো নিউজকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনকে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নানা বিষয় বা ফ্যাক্টর থাকে। এখানে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপি না এলেও তাদের কর্মী-সমর্থকরা নানাভাবে ছিলেন। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির মতো একটা বড় দল অংশ না নিলে সেটার চিত্র হবে একেবারেই ভিন্ন। তবে এটাও ঠিক যে, আওয়ামী লীগের প্রার্থী ভালো হলে এবং দল সুসংগঠিত থাকলে বিজয় পাওয়া সম্ভব।’

তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আগামীতে যে নির্বাচনটা হবে। সেটা একটা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে হবে। যার মধ্য দিয়ে জনগণ তার ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাবে। এটা এবারের নির্বাচনে খুব জরুরি। তবে, এটা সবার জন্য চ্যালেঞ্জ। আওয়ামী লীগের পাশাপাশি বিএনপির জন্য আরও বেশি চ্যালেঞ্জ। কারণ, বিএনপি যে দাবি নিয়ে নামছে, এটা আবার ভিন্ন। তারা সরকারের পদত্যাগ চায়। তারা এ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনেই যাবে না। কিন্তু এরকম একটা দাবি আদায়ের জন্য যে কৌশল অবলম্বন করতে হবে, সেটা দেখতে পাচ্ছি না।’

‘শুধু বিদেশিদের ওপর নির্ভর করে, তারাই সব করে দেবে। এটা যথেষ্ট নয়। বিদেশিরা কখনো কোনো দলকে সুদৃঢ় জায়গায় নেবে না, যদি ডমেস্টিক (অভ্যন্তরীণ) চাপ তৈরি না হয়। এই চাপ কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি না। শুধু দু-একটা মিছিল-মিটিং করে এই দাবি আদায় করা যাবে না। আমরা কিন্তু খুব দ্রুতই নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, ‘সিটি করপোরেশন নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে। কোনো প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন হয়নি। স্থানীয় সরকারের এসব নির্বাচনের মতো আগামী জাতীয় নির্বাচনও সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে। এই নির্বাচনগুলোতে বিএনপি অংশ নেয়নি। তারপরও মানুষের যে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ তাতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, আগামী জাতীয় নির্বাচনেও যদি বিএনপি না আসে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেবে, কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে না।’

দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, গেলো দুই সিটি নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ ছিল এবং আওয়ামী লীগের প্রতি ও আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন পাওয়া গেছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষের সমর্থন নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা এভাবেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে, ইনশাআল্লাহ।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও জাতীয় সংসদের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, ‘সম্প্রতি অনুষ্ঠিত খুলনা এবং বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জনগণ উন্নয়ন ও মানবকল্যাণের প্রতি আস্থা রেখে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছেন। এজন্য ভোটারগণের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। আমাদের বিশ্বাস, আগামী নির্বাচনগুলোতেও সম্মানিত ভোটাররা নৌকার প্রতি আস্থা অব্যাহত রাখবেন।’

সরকারের নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘স্বপ্নের পদ্মা সেতুর কারণে দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষের দুয়ার খুলে গেছে। পদ্মা সেতুর প্রতিফলন বরিশাল ও খুলনার নির্বাচনে পড়েছে। জনগণ ভোটাধিকারের মাধ্যমে সেটা প্রমাণ করেছেন। আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনেও জনগণ ভোটাধিকারের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের পক্ষে, শেখ হাসিনার পক্ষে, নৌকার পক্ষে থাকবে। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলতে জনগণ নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগের বিজয় সুনিশ্চিত করবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights