সুইজারল্যান্ডে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বৈঠকে কী অগ্রগতি হলো?

অনলাইন ডেস্ক
দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও সংঘাতের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির দাবি করেছেন মধ্যস্থতাকারী কাতার ও পাকিস্তান। দুই দেশ জানিয়েছে, আলোচনায় অংশ নেওয়া পক্ষগুলো ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটি রোডম্যাপে সম্মত হয়েছে।

সুইজারল্যান্ডের লেক লুসার্নে প্রায় ১২ ঘণ্টাব্যাপী ম্যারাথন বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, আলোচনা ইতিবাচক ও উৎসাহব্যঞ্জক ছিল। এর আগে ১৭ জুন স্বাক্ষরিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের একটি কাঠামো তৈরি করেছিল, যা পরবর্তী আলোচনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

উচ্চপর্যায়ের কমিটি ও সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা
যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, আলোচনার রাজনৈতিক তদারকির জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি আগামী ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে কাজ করবে। একই সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, পর্যবেক্ষণ এবং বিরোধ নিষ্পত্তি সংক্রান্ত পৃথক কর্মী দলও গঠন করা হয়েছে।

প্রধান আলোচকরা নিয়মিতভাবে এই কমিটির কাছে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেবেন এবং সমঝোতা স্মারকের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবেন।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো যতটা সহজ হয়েছে, কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা ততটাই জটিল হতে পারে। বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ, আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের পরিধি এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সময়সূচি এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ ফেলো থমাস ওয়ারিকের মতে, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ হ্রাস বা অপসারণের জন্য হাজার হাজার বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন হতে পারে, যার মধ্যে বিপুল সংখ্যক মার্কিন বিশেষজ্ঞও থাকতে পারেন। তবে ইরান এ ধরনের প্রস্তাবে কতটা সম্মত হবে, তা নিয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।

হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা এড়াতে নতুন যোগাযোগ লাইন
চুক্তির অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ যোগাযোগ ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো ভুল বোঝাবুঝি ও অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক ঘটনার ঝুঁকি কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালীর মাধ্যমে হয়ে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের কার্যত অবরোধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয় এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

লেবানন ইস্যুতে ‘ডি-কনফ্লিকশন সেল’
আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হলো লেবাননে চলমান সংঘাত নিরসনের লক্ষ্যে একটি ‘ডি-কনফ্লিকশন সেল’ গঠন। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধ এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখার চেষ্টা করা হবে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, লেবানন যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই নতুন ব্যবস্থার কার্যকারিতাই হবে চুক্তির প্রথম বড় পরীক্ষা।

এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনী তাদের নিরাপত্তা অঞ্চল ধরে রাখবে যতদিন প্রয়োজন মনে করবে। বর্তমানে ইসরায়েল-নিয়ন্ত্রিত বাফার জোনটি লেবাননের প্রায় ৬ শতাংশ ভূখণ্ডজুড়ে বিস্তৃত।

অন্যদিকে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কুদস ফোর্সের প্রধান ইসমাইল কানি সতর্ক করে বলেছেন, ইসরায়েল যদি দক্ষিণ লেবাননে অবস্থান অব্যাহত রাখে, তাহলে ২০০০ সালের মতো অপমানজনকভাবে সরে যেতে বাধ্য হবে।

ইসরায়েলের জন্য নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জ
অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লাহ থেকে আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি বিশ্লেষকরা সুইজারল্যান্ড বৈঠকের ফলাফলকে একটি কৌশলগত দ্বিধা হিসেবে দেখছেন।

এর আগে হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সমন্বয়ের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছিল। কিন্তু এবার ইরান সরাসরি আলোচনার অংশ হওয়ায় নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। ফলে ইসরায়েলকে নতুন সমীকরণের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

তবে কিছু বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন, লেবানন ও ইসরায়েল সরাসরি আলোচনায় অংশ না নেওয়ায় এই ব্যবস্থার বাস্তব কার্যকারিতা কতটা হবে। তাদের মতে, বহিরাগত শক্তির মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ সংঘাত সমাধান করা সবসময় সহজ নয়।

নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও জব্দ সম্পদ মুক্তির দাবি
আলোচনার পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রফতানির ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি অবরোধ প্রত্যাহার, জব্দকৃত কিছু ইরানি সম্পদ মুক্ত করা এবং ইরানের পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা চালুর বিষয়েও অগ্রগতি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তবে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে এসব দাবির সত্যতা এখনও নিশ্চিত করেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রশ্নটি ওয়াশিংটনের জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। বিশেষ করে মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হলে তা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

সামনে কী?
সুইজারল্যান্ডের বৈঠককে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং লেবানন সংকটসহ একাধিক জটিল বিষয় এখনও চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়নি।

আগামী দুই মাসে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা এবং উচ্চপর্যায়ের কমিটির তৎপরতার ওপরই নির্ভর করবে এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত একটি স্থায়ী ও ব্যাপক চুক্তিতে রূপ নিতে পারে কি না। সূত্র: আল-জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights