স্ট্রোক-পরবর্তী প্যারালাইসিসে ফিজিওথেরাপি ও রিহ্যাবিলিটেশন

ডা. এম ইয়াছিন আলী

প্রতিবছর ২৯ অক্টোবর বিশ্ব স্ট্রোক দিবস পালিত হয়। দিবসটির উদ্দেশ্য হলো স্ট্রোক সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং স্ট্রোকজনিত অক্ষমতা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে মানুষকে উৎসাহিত করা। বিশ্ব স্ট্রোক দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য ‘The Time Is Now’ (এখনই সময়); এই প্রতিপাদ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্ট্রোক প্রতিরোধ, দ্রুত চিকিৎসা এবং পরবর্তী পুনর্বাসনে উদ্যোগ নেওয়ার সময় এখনই।

স্ট্রোক কী ও কেন হয়?

মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে অথবা মস্তিষ্কের রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে স্ট্রোক হয়। এর ফলে মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, ধূমপান, স্থূলতা, অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।

স্ট্রোকের পর অনেক রোগীর শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে যায় অথবা সম্পূর্ণ অবশ হয়ে পড়ে। একে হেমিপ্লেজিয়া বা হেমিপ্যারেসিস বলা হয়। কারও হাঁটাচলা, হাতের কাজ, কথা বলা, গিলতে পারা কিংবা দৈনন্দিন কাজ সম্পাদনে সমস্যা দেখা দেয়। ফলে রোগীকে দীর্ঘদিন অন্যের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হতে পারে। তবে সময়মতো চিকিৎসা ও পরিকল্পিত পুনর্বাসনের মাধ্যমে অনেক রোগীর কার্যক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করা সম্ভব।

স্ট্রোকের লক্ষণ চিনুন, দ্রুত হাসপাতালে নিন

স্ট্রোকের লক্ষণ সাধারণত হঠাৎ দেখা দেয়। মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, এক হাত বা পা দুর্বল হয়ে পড়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, কথা বুঝতে অসুবিধা, হঠাৎ দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, ভারসাম্য হারানো কিংবা তীব্র মাথাব্যথা হতে পারে সতর্কসংকেত।

এসব লক্ষণ দেখা দিলে একমুহূর্তও দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। লক্ষণ কখন শুরু হয়েছে, সেই সময়টি মনে রাখা জরুরি। স্ট্রোকের ধরন নির্ণয় করে চিকিৎসক দ্রুত উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। নিজে থেকে ওষুধ, বিশেষ করে অ্যাসপিরিন, দেওয়া উচিত নয়; কারণ রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকের ক্ষেত্রে তা ক্ষতিকর হতে পারে।

স্ট্রোক-পরবর্তী প্যারালাইসিসে ফিজিওথেরাপির গুরুত্ব

স্ট্রোকের চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীর সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে ফিজিওথেরাপি ও রিহ্যাবিলিটেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মস্তিষ্কের ক্ষতির কারণে হারিয়ে যাওয়া নড়াচড়া, ভারসাম্য ও দৈনন্দিন কাজের দক্ষতা পুনরুদ্ধারে নিয়মিত ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক পুনর্বাসন কার্যকর ভূমিকা রাখে।

রোগীর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল হলে চিকিৎসক ও পুনর্বাসন দলের পরামর্শে যত দ্রুত সম্ভব পুনর্বাসন শুরু করা উচিত। ফিজিওথেরাপিস্ট রোগীর দুর্বলতা, পেশির শক্তি, জয়েন্টের নড়াচড়া, ভারসাম্য ও চলাফেরার সক্ষমতা মূল্যায়ন করে চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করেন।

ফিজিওথেরাপির গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে—

১. জয়েন্টের নড়াচড়া ও পেশির নমনীয়তা বজায় রাখা: আক্রান্ত হাত-পায়ের উপযুক্ত ব্যায়াম জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া, পেশি সংকুচিত হওয়া এবং ব্যথার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

২. পেশির শক্তি ও নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি: ধাপে ধাপে নির্ধারিত ব্যায়ামের মাধ্যমে রোগীর নড়াচড়ার ক্ষমতা উন্নত করা হয়।

৩. বসা, দাঁড়ানো ও হাঁটার প্রশিক্ষণ: ভারসাম্য অনুশীলন, স্থানান্তর প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী হাঁটার সহায়ক উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে রোগীকে নিরাপদে চলাফেরা করতে শেখানো হয়।

৪. হাতের কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনা: দৈনন্দিন কাজের উপযোগী পুনরাবৃত্তিমূলক অনুশীলনের মাধ্যমে হাতের ব্যবহার ও সমন্বয় উন্নত করার চেষ্টা করা হয়।

৫. জটিলতা প্রতিরোধ: সঠিক অবস্থানে শোয়ানো ও বসানো, আক্রান্ত কাঁধের যত্ন, নিরাপদ চলাচল এবং উপযুক্ত ব্যায়াম ব্যথা, জয়েন্টের সমস্যা ও দীর্ঘক্ষণ শুয়ে থাকার কারণে সৃষ্ট জটিলতার ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।

সমন্বিত পুনর্বাসন কেন প্রয়োজন?

স্ট্রোকের পর শুধু ফিজিওথেরাপিই নয়, রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি, গিলতে পারার সমস্যা ব্যবস্থাপনা, পুষ্টি পরামর্শ এবং মানসিক সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ। নিউরোলজিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, অন্যান্য পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞ ও পরিবারের সদস্যদের সমন্বিত প্রচেষ্টা রোগীর পুনরুদ্ধারকে আরও কার্যকর করতে পারে।

পরিবারের সদস্যদের রোগীকে নিরাপদে বসানো, স্থানান্তর করা, নির্ধারিত ব্যায়ামে সহায়তা করা এবং নিয়মিত চিকিৎসা অনুসরণ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ নেওয়া উচিত। রোগীকে অতিরিক্ত নির্ভরশীল না করে তার সামর্থ্য অনুযায়ী নিজে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। তবে প্রশিক্ষণ ছাড়া জোর করে হাঁটানো বা আক্রান্ত হাত টেনে তোলা উচিত নয়।

প্রতিরোধ ও সচেতনতাই প্রধান

স্ট্রোক প্রতিরোধে রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান পরিহার, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে স্ট্রোকের লক্ষণ সম্পর্কে পরিবার ও সমাজের সচেতনতা বাড়াতে হবে।

লেখক: ডা. এম ইয়াছিন আলী, চেয়ারম্যান ও চিফ কনসালটেন্ট, ঢাকা সিটি ফিজিওথেরাপি হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights