স্বাস্থ্যকর জীবন কি সত্যিই ব্যয়বহুল
আশিক উল বারাত
সকালের শুরুটা সিগারেট দিয়ে। এরপর ক্ষুধা লাগলেই রাস্তার সিঙ্গারা, তেলচমচমে সমুচা, পুরি। দুপুর কিংবা রাতে কখনো পিজ্জা, কখনো ফাস্টফুড। ২৪ বছরের শামীমের কাছে এটাই যেন স্বাভাবিক জীবন। দিনে ১০ থেকে ১২টি সিগারেট খাওয়ার অভ্যাসও তাঁর। স্বাস্থ্যকর খাবার কিংবা নিয়মিত শরীরচর্চার কথা উঠলেই তাঁর মুখে আসে একটাই কথা, ‘স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন করা তো বেশ ব্যয়বহুল।’
শামীমের এই ধারণা একেবারে আলাদা কিছু নয়। তাঁর মতো অনেক তরুণের কাছেই স্বাস্থ্যকর জীবন মানে দামি ফল, পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত জিম আর বাড়তি খরচ। তাই কম দামে পেট ভরে যায় এমন খাবার, দিনের শেষে একটু বিশ্রাম আর পুরোনো অভ্যাসেই স্বস্তি খুঁজে নেন অনেকে।
কিন্তু হিসাবটা যদি একটু অন্যভাবে করা হয়? প্রতিদিনের সিঙ্গারা, সমুচা কিংবা সিগারেটের খরচের সঙ্গে যদি ভবিষ্যতের চিকিৎসার খরচটাও যোগ করা হয়, তাহলে ছবিটা কি একই থাকে?
প্রশ্নটা সেখানেই। স্বাস্থ্যকর জীবন কি সত্যিই ব্যয়বহুল, নাকি অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসের খরচগুলো প্রতিদিন অল্প অল্প করে যায় বলে তা চোখে কম পড়ে?
ছোট খরচের হিসাব
একটি সিঙ্গারা বা সমুচার দাম হয়তো খুব বেশি নয়। একবারে পকেটে বড় চাপও পড়ে না। কয়েকটি সিগারেট কিনতেও হয়তো মনে হয়, আহামরি কী খরচ! কিন্তু প্রতিদিনের এই ছোট খরচগুলো মাসের শেষে কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেই হিসাব অনেকেই রাখেন না।
তরুণ বয়সে বিষয়টি আরও সহজে এড়িয়ে যাওয়া যায়। শরীর তখন অনেক কিছু সামলে নিতে পারে। অনিয়মিত খাবার, ধূমপান, শরীরচর্চার অভাব কিংবা রাত জাগার অভ্যাসের তাৎক্ষণিক ফলও অনেক সময় চোখে পড়ে না। তাই মনে হয়, সব ঠিকই তো আছে।
কিন্তু শরীরের সব ক্ষতির হিসাব সঙ্গে সঙ্গে সামনে আসে না। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও অনিয়মিত জীবনযাপন দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তখন আজ যে টাকা বাঁচছে বলে মনে হচ্ছে, ভবিষ্যতে তার চেয়ে বেশি অর্থ চলে যেতে পারে চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের পেছনে।
ডাক্তার শাকিল আহমেদ বলেন, ‘স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন আপাতদৃষ্টিতে আমাদের কাছে কিছুটা ব্যয়বহুল মনে হতে পারে। পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্ন নিতে হয়তো কিছুটা অতিরিক্ত খরচ করতে হয়। কিন্তু ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করলে এই খরচই আসলে আমাদের জন্য সাশ্রয়ী একটি বিনিয়োগ।’
তিনি বলেন, ‘অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসা, ওষুধ ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পেছনে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, তার তুলনায় সুস্থ থাকার জন্য আগে থেকেই সচেতন হওয়া অনেক বেশি লাভজনক। তাই স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন শুধু আমাদের জীবনকে সুন্দর ও কর্মক্ষম রাখে না, ভবিষ্যতের চিকিৎসা ব্যয়ও কমাতে সাহায্য করে। সুস্থতার পেছনে আজকের খরচকে তাই খরচ না ভেবে ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত।’
স্বাস্থ্যকর খাবার কি দামি
স্বাস্থ্যকর খাবারের কথা উঠলেই অনেকের মনে প্রথমে আসে দামি ফল, বিশেষ ধরনের খাদ্যপণ্য কিংবা নানা রকম সাপ্লিমেন্টের কথা। অথচ স্বাস্থ্যকর খাবারের অনেক উপকরণ আমাদের প্রতিদিনের বাজারেই আছে।
ভাত, ডাল, শাকসবজি, দেশীয় মাছ, ডিম, কলা, পেয়ারা, পেঁপে, আমড়া কিংবা মৌসুমি ফল দিয়েই সুষম খাবারের অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব।
ফিটনেস কোচ আসিফ মোহাম্মদ বিল আলম বলেন, ‘দেশি ফলগুলো কিন্তু কম দামেই কিনতে পাওয়া যায়। আবার ডিম কিংবা প্রোটিন সোর্স হিসেবে মুরগির দামও খুব বেশি নয়। প্রতিদিন যদি কেউ অন্তত দুটি ডিম খায়, তাহলে ২০ টাকার মতো খরচ হয়। আর ১০০ গ্রাম চিকেন খেলে ৩০ টাকার মতো খরচ হয়। কেউ যদি চায়, সারাদিন মাত্র ১৫০ টাকার মধ্যেই কিন্তু স্বাস্থ্যকর জীবন কাটাতে পারে।’
অর্থাৎ স্বাস্থ্যকর খাবার মানেই বাজারের সবচেয়ে দামি খাবারটি কিনতে হবে, এমন নয়। নিজের সামর্থ্যের মধ্যে সহজলভ্য খাবার বেছে নেওয়া এবং খাবারের তালিকায় নিয়ম আনা দিয়েই শুরু হতে পারে পরিবর্তন।
শরীরচর্চা মানেই জিম নয়
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের কথা উঠলে আরেকটি বিষয় সামনে আসে জিম। আধুনিক জিম, মাসিক ফি, পোশাক কিংবা নানা সরঞ্জামের কথা ভেবে অনেকেই শুরু করার আগেই পিছিয়ে যান।
কিন্তু শরীরচর্চার জন্য প্রথমেই জিমে যেতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। হাঁটা, সিঁড়ি ব্যবহার, বাড়িতে নিজের শরীরের ওজন দিয়ে ব্যায়াম কিংবা বাইরে দৌড়ানোর মতো অভ্যাসের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হয় না।
আন্তর্জাতিক সার্টিফায়েড ফিটনেস কোচ এবং বাংলাদেশ বডিবিল্ডিং ফেডারেশনের বিচারক আব্দুল্লাহ আল খালেদ বলেন, ‘অনেকেই মনে করেন, সুস্বাস্থ্য ধরে রাখতে হলে জিমে যেতেই হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিদিনের ছোট ছোট কিছু অভ্যাসের পরিবর্তনও আমাদের আরও সক্রিয় ও সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘যেমন নিয়মিত পার্কে বা রাস্তায় ৩০ মিনিট হাঁটা, লিফটের পরিবর্তে সিঁড়ি ব্যবহার করা, কাছাকাছি দূরত্বে গাড়ি না নিয়ে হেঁটে যাওয়া, দীর্ঘ সময় বসে না থেকে মাঝে মাঝে হাঁটাচলা করা।’
নিয়মিত জিম করেন রিফাত। তাঁর কাছে জিম শুধু শরীর ঠিক রাখার জায়গা নয়, নিজের জন্য কিছুটা সময় রাখারও একটি সুযোগ।
রিফাত বলেন, ‘হালকা একটু ওজন তুললেও মানসিকভাবে আত্মবিশ্বাসী লাগে। জিমে এসে এই সময়টা বাইরে গিয়ে আড্ডা দেওয়ার থেকে তো ভালো। জিমে মাসে এক হাজার টাকা খরচ করলেই ঢাকায় মোটামুটি মানের জিমের মেম্বারশিপ নেওয়া যায়। এটাও খরচ করতে না চাইলে সকালে উঠে অন্তত ৩০ মিনিট তো নিজেকে ভালোবেসে দেওয়া যায়।’
এই কথার মধ্যে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের আরেকটি হিসাব আছে। সেখানে শুধু টাকা নয়, নিজের জন্য সময় রাখাটাও গুরুত্বপূর্ণ।
একটু হাঁটা, একটু স্বস্তি
ম্যারাথনসহ বিভিন্ন ফিটনেস প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া সাংবাদিক তাজনুর ইসলামের কাছে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সবচেয়ে সহজ অভ্যাসগুলোর একটি হলো হাঁটা।
তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে, প্রতিদিন এই যে হাঁটার অভ্যাস, এতে যে কী পরিমাণ মন ফুরফুরে থাকে। আর এতে তো খরচও নেই, তাই না। এ ছাড়া নিয়মিত সময়মতো ঘুমানো আর বাইরের ভাজাপোড়া ও চিনি খাওয়া কমানোর পর কর্মক্ষমতা বেড়েছে ১০ গুণ। হিসাব করে দেখলেই বোঝা যায়, এতে শুধু একটু এফোর্টের প্রয়োজন হয়, অর্থ নয়।’
‘আর বড় অসুখে পরবর্তীতে খরচ করার চেয়ে এটাই তো একটা সঞ্চয় হয়ে রইল,’ বলেন তাজনুর।
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন তাই শুধু কী খাচ্ছি বা কতটা ব্যায়াম করছি, তার হিসাব নয়। পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ কমানো এবং নিজের জন্য কিছুটা সময় রাখাও এর অংশ।
শরীরচর্চা শুধু শরীরের গঠন বদলানোর জন্য নয়। অনেকের কাছে এটি দিনের চাপ কমানোর, নিজের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোরও উপায় হয়ে ওঠে।
নারীদের স্বাস্থ্যও গুরুত্বপূর্ণ
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের আলোচনায় নারীদের বিষয়টিও আলাদা গুরুত্ব পায়। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে পুষ্টি, রক্তস্বল্পতা, হাড়ের স্বাস্থ্য, মাসিককালীন স্বাস্থ্য, শারীরিক পরিবর্তন, মানসিক চাপ ও প্রজননস্বাস্থ্যের মতো বিষয় সামনে আসে।
অনেক নারী নিজের স্বাস্থ্যের চেয়ে পরিবার বা কাজকে বেশি গুরুত্ব দেন। ফলে শরীরে কোনো সমস্যা দেখা দিলেও চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন।
নিজের শরীরের পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন থাকা, প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং নিজের জন্য সময় রাখাও তাই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ।
পরীক্ষার খরচ, নাকি সচেতনতা
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিয়েও মানুষের মধ্যে দ্বিধা আছে। কারও কাছে এটি বাড়তি খরচ, আবার কারও কাছে শরীরে সমস্যা হওয়ার আগেই নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার একটি উপায়।
তবে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা মানেই সবার জন্য একই ধরনের অসংখ্য পরীক্ষা করা নয়। বয়স, শারীরিক অবস্থা, পারিবারিক ইতিহাস ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাই গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো সমস্যা শুরুতেই শনাক্ত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে। তাই স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন থাকার বিষয়টি কেবল খরচের হিসাবেও দেখা যায় না।
শেষ হিসাবটা নিজের
শামীমের কাছে স্বাস্থ্যকর জীবন হয়তো এখনো ব্যয়বহুল। কিন্তু স্বাস্থ্যকর জীবন মানেই দামি ফল, দামি জিম কিংবা নিয়মিত সাপ্লিমেন্ট কেনা নয়।
এর শুরু হতে পারে খুব সাধারণ কিছু অভ্যাস দিয়ে। সিগারেট ছাড়ার চেষ্টা, রাস্তার ভাজাপোড়ার বদলে ঘরের খাবার, কোমল পানীয়ের বদলে পানি, অলস সময়ের বদলে কিছুটা হাঁটা, রাত জাগার বদলে পর্যাপ্ত ঘুম।
এসবের অনেক কিছুর জন্য বাড়তি টাকা লাগে না। বরং কিছু ক্ষেত্রে খরচ কমতেও পারে।
অবশ্য স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে কিছু খরচ থাকবেই। ভালো খাবার, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ কিংবা শরীরচর্চার জন্য অর্থ ব্যয় হতে পারে। কিন্তু সেই খরচকে শুধু ব্যয় হিসেবে দেখলে হিসাবটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
কারণ অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসা, ওষুধ, পরীক্ষা কিংবা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পেছনে যে অর্থ ব্যয় হতে পারে, সেটিও জীবনের হিসাবের অংশ।
তাই স্বাস্থ্যকর জীবন সত্যিই কতটা ব্যয়বহুল, সেই উত্তর শুধু টাকার অঙ্কে পাওয়া যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সময়, অভ্যাস, সচেতনতা আর নিজের প্রতি যত্ন।
শামীমের প্রতিদিনের সিগারেট কিংবা সিঙ্গারার পেছনে যে টাকা যাচ্ছে, তা হয়তো আজ খুব বেশি মনে হচ্ছে না। কিন্তু প্রতিদিন নিজের শরীরের জন্য কয়েকটি ছোট সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস তৈরি করতে পারলে সেই হিসাব বদলাতে পারে।
শেষ পর্যন্ত সুস্থ থাকার সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হয়তো দামি কোনো খাবার নয়।
