হরমুজে অস্থিরতা, তবুও জ্বালানি তেলের দাম কেন খুব বেশি লাগাম ছাড়ায়নি?

অনলাইন ডেস্ক
নিউ ইয়র্ক, লন্ডন কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত মরুভূমি; সব জায়গায় একটাই প্রশ্ন, ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের মধ্যেও কেন পাগলা ঘোড়ার মতো ছোটাছুটি করছে না বিশ্ব জ্বালানির বাজার? মধ্যপ্রাচ্যের বুকে যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের সংঘাতের প্রায় পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও তেলের বাজারে সেই চেনা রক্তক্ষয়ী রূপ দেখা যায়নি। অথচ যুদ্ধের শুরুতেই বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করেছিলেন, বিশ্ব বাণিজ্যের লাইফলাইনখ্যাত হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম এক লাফে দেড়শো থেকে দুশো ডলারে গিয়ে ঠেকবে।

বাস্তবতার চিত্র কিন্তু ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্স সর্বোচ্চ ১২৬ ডলারে গিয়ে থেমে যায় এবং সংঘাত শুরুর পর থেকে জুন পর্যন্ত গড়ে দাম মোটে ১০১ ডলারে আটকে ছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক পদক্ষেপ স্থগিত করার পর জুনের মধ্যভাগে দাম হুড়মুড় করে একেবারে সাকুল্যে ৭০ ডলারে নেমে আসে। সংঘাতের এমন তীব্রতার মাঝেও তেলের দাম কেন নাগালের বাইরে চলে যায়নি, তার পেছনে লুকিয়ে আছে এক অবিশ্বাস্য অর্থনৈতিক সমীকরণ।

সবচেয়ে বড় চমকটি এসেছে চীন থেকে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই তেল আমদানিকারক দেশটিতে হঠাৎ করেই জ্বালানির চাহিদা তলানিতে গিয়ে ঠেকে। জুনের মধ্যে চীনের অপরিশোধিত তেল আমদানির পরিমাণ প্রায় দশ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে আসে। সাধারণ মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে বৈদ্যুতিক ট্যাক্সির ব্যবহার বাড়িয়ে দেওয়ায় এবং পেট্রোকেমিক্যাল খাতের সংকোচন ঘটায় বিশ্ববাজারে তেলের বাড়তি চাপের মুখে এক বিরাট স্বস্তি মিলেছে।

একই সময়ে মুদ্রার উল্টো পিঠে যুক্তরাষ্ট্র রেকর্ড পরিমাণ তেল উৎপাদন করে পরিস্থিতি সামাল দেয়। এপ্রিলে দেশটির দৈনিক তেল উৎপাদনের পরিমাণ ১৩৯.৩ লক্ষ ব্যারেলে পৌঁছায়, যা সর্বকালের রেকর্ড। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার সাথে সমন্বয় করে মার্কিন কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ থেকে রেকর্ড পরিমাণ তেল বাজারে ছেড়ে দেওয়া হয়, যা চলমান সরবরাহ ঘাটতিকে খুব সফলভাবেই ঢেকে দেয়।

বাজারের এই শান্ত অবস্থার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছেন স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প। শান্তিচুক্তি এবং হরমুজ প্রণালিতে ফের জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার বার্তা দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দফায় দফায় তেলের বাজারের কারবারিদের চমকে দিয়েছেন। হঠাৎ বাজার উল্টে যাওয়ার ভয়ে বড় ধরনের তেজি বা বুলিশ বাজি ধরতে সাহস পাননি ট্রেডাররা। ফলে বাজারের তরলতা কমে যায় এবং খবরের ঘনঘটায় একধরনের চরম ক্লান্তি ভর করে বিনিয়োগকারীদের মনে।

হরমুজ প্রণালি সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও বিকল্প পথের সন্ধান করতে দেরি করেনি উপসাগরীয় দেশগুলো। সৌদি আরব তাদের লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে তেল রপ্তানি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যা হরমুজ দিয়ে তেল আটকা পড়ার ক্ষতি অনেকটা পুষিয়ে দেয়। যদিও জুনে প্রণালিটি দিয়ে চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক হলেও জুলাইয়ে লড়াই নতুন করে শুরু হওয়ায় তা আবার বাধাগ্রস্ত হয়।

তবে বাজারে সবচেয়ে বড় ধাক্কা সামাল দিয়েছে ভৌত বা ফিজিক্যাল বাজারের পর্যাপ্ত সরবরাহ। ইউরোপের উত্তর সাগরের ফোর্টিসের মতো গ্রেডগুলোর দাম রেকর্ড প্রিমিয়াম থেকে নাটকীয়ভাবে কমে ডিসকাউন্টে নেমে আসে। অভিজ্ঞ ট্রেডাররা বলছেন, বাজারে এই মুহূর্তে পর্যাপ্ত কাঁচা তেল বা প্রম্পট ক্রুড ঘুরে বেড়াচ্ছে, যদিও এই স্বস্তি চিরস্থায়ী নাও হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে যুদ্ধের দাবানল আর ভূরাজনৈতিক উত্তাপের এত সব অন্ধের মতো লাফালাফি সত্ত্বেও জ্বালানির বৈশ্বিক বাজারে এক অদ্ভুত স্থবিরতা বজায় রয়েছে। চীন ও আমেরিকার কৌশলগত চাল, বিকল্প রপ্তানি রুট এবং ট্রেডারদের চরম সতর্কতা তেলের বাজারকে বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছে। তবে যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, বাজারের এই পাতলা সুতোর টান যেকোনো মুহূর্তে বড় কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস হয়ে দেখা দিতে পারে।

রয়টার্সের বিশ্লেষণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights