হামের টিকা না দিয়ে শিশুহত্যা সুশীল সমাজ নীরব কেন?
অদিতি করিম
ওসমানী উদ্যানে গাছ জড়িয়ে ধরে রিজওয়ানা হাসানসহ সুশীলদের কান্নার কথা মনে আছে? চীনা অর্থায়নে বাংলাদেশে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র নির্মাণ করার জন্য ওসমানী উদ্যানকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করা হয়েছিল। সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আমাদের সুশীল সমাজের একাংশ হঠাৎই বৃক্ষপ্রেমী হয়ে ওঠেন। তারা ওসমানী উদ্যানে গিয়ে বৃক্ষ ধরে মেকি কান্নার নাটক করেন। সেখানে তাদের হাতে ফেস্টুন ছিল। সেই ফেস্টুনে লেখা ছিল বৃক্ষ হত্যা অপরাধ। তৎকালীন সরকার সুশীলদের কান্নাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র আগারগাঁওয়ে সরিয়ে নেয়। এই ঘটনায় রিজওয়ানা বিশাল পরিবেশবাদী হিসেবে পরিচিতি পান। ডলার বাণিজ্যের পথ উন্মুক্ত হয়ে যায় রিজওয়ানার। ২০২৪ সালে নিজেই যখন উপদেষ্টা হন তখন তার মধ্যে বৃক্ষপ্রেম দেখা না গেলেও অর্থপ্রেম ছিল প্রকট। সে প্রসঙ্গ এখানে আলোচনা না-ই বা করলাম। বৃক্ষপ্রেমিক রিজওয়ানা এবং আমাদের সুশীলরা হামে শিশুমৃত্যু নিয়ে কান্না করেন না। যাদের সীমাহীন অবহেলায় এসব শিশু মারা যাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ তো দূরের কথা একটা কথা বলেন না?
১৯৯৪ সাল। শান্ত শহর দিনাজপুরে একটি অনাকাক্সিক্ষত দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। গভীর রাতে গাড়ির অপেক্ষায় থাকা ইয়াসমিন ধর্ষিতা হন পুলিশের হাতে। পরে তাকে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। তৎকালীন বিএনপি সরকার তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করে, অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের সাসপেন্ড করা হয়। কিন্তু সুশীলরা পেলেন এক মহা ইস্যু। ঢাকায় সুশীলরা রাজপথে গড়াগড়ি দিলেন। মশাল মিছিল করলেন। তাদের আহাজারি দেখে আমরা আপন মনে বললাম আহারে এদের কত মায়া। মানুষের জন্য এদের কত না প্রেম। কিন্তু কোনো সুশীল ইয়াসমিনের পরিবারকে দুই টাকার সাহায্য করেনি। নিহত ইয়াসমিনের বৃদ্ধা মা বহু কষ্টে বলেছিলেন, সবাই তো খালি মিছিল করে, আমার তো ক্ষুধায় পেট জ্বলে। সুশীলরা ইয়াসমিন ইস?্যুকে পুঁজি করে পাঁচতারকা হোটেলে জাঁকজমকপূর্ণ সেমিনার করেন, নারী মুক্তি নিয়ে বুলি কপচান। বিদেশ থেকে ডলার আসে। সেই ডলারে ইয়াসমিনদের ভাগ্যের পরিবর্তন না হলেও সুশীলদের বিত্তবৈভব বাড়ে। এখন বাংলাদেশে সুশীলদের মহাজনদের গাফিলতিতে শত শত শিশুর মৃত্যু নিয়ে কেন প্রতিবাদ নেই সেই সুশীলদের? তারা কেন একটি বিবৃতি পর্যন্ত দেন না? ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুজন শিক্ষার্থী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। সারা দেশে শুরু হয় নিরাপদ সড়ক আন্দোলন। মূলত শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনকে রঙিন করে তোলেন আমাদের সুশীল সমাজের কিছু প্রতিনিধি এবং শোবিজ অঙ্গনের কিছু তারকা। তাদের আবেগ, কান্না, প্রতিবাদের ধরন বলিউড সিনেমা ‘নো ওয়ান কিলড জেসিকার’ প্রতিবাদের মতোই রোমান্টিক আবহ পায়। নায়ক-নায়িকাদের রঙিন পোশাক আর চমৎকার কথাবার্তা শোকের বদলে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে দেয়। এখনো সড়কে মানুষের মৃত্যু হয়। প্রতিদিন দুর্ঘটনায় কত জীবন ঝরে যায় তার খবর কি সুশীলরা এখন আর রাখেন? এসব দরদি তারকারা আজ কোথায়? হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য তাদের কান্না নেই, নেই আবেগ কিংবা সমবেদনা। তারা কেন মানবিক বোধশূন?্য হলেন? ২০২৪-এর গণ আন্দোলনের কথা তো নিশ্চয় আমাদের সবারই মনের গভীরে জায়গা করে নিয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনের একপর্যায়ে যুক্ত হন আমাদের সুশীল সমাজের কিছু প্রতিনিধি। বেশ কয়েকজন শোবিজ তারকা বৃষ্টিতে ভিজে সিনেমার শুটিংয়ের ঢংয়ে প্রতিবাদ করেন। তাদের এই প্রতিবাদ দেখতেও রাজপথে নেমে আসেন বহু মানুষ।
আইনজীবীরা কোর্টে গিয়ে শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। কিন্তু এখনো একজন আইনজীবী শিশুর ঘাতকের বিচারের জন্য আদালত দাঁড়িয়ে বললেন না, হামে আক্রান্ত শিশুদের আসলে হত্যা করা হয়েছে। আমরা হত্যাকারীদের বিচার চাই।
এরকম অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। যেকোনো মানবিক ইস্যুতে আমাদের সুশীল সমাজ এবং শোবিজ তারকারা সোচ্চার হন। শুধু বাংলাদেশে নয়; সারা বিশ্বেই যেকোনো সংকটে, যুদ্ধে, অত?্যাচার নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিবেকবান মানুষ এবং সেলেব্রিটিরা এগিয়ে আসেন। ন্যায়ের পক্ষে অন?্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। গাজায় মানবিক বিপর্যয়ে বিশ্বের বিবেকবান মানুষের প্রতিবাদ আমাদের মানবিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করেছে। ইরান যুদ্ধে শিশুহত্যার নিন্দা জানিয়েছেন হলিউডের তারকা থেকে শুরু করে বিশ্বের শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বরা। যদিও বাংলাদেশের সুশীল সমাজ, মানবাধিকার সংগঠন কিংবা শোবিজ তারকারা এসব নিপীড়নের বিরুদ্ধে একটা টুঁ শব্দও করেননি। আমরা ধরেই নিতে পারি, আমাদের সুশীল সমাজ এবং সেলেব্রিটিরা দেশ নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বর্বরতা তাদের আবেগতাড়িত করে না। কিন্তু তাই বা বলি কী করে? এই তো কদিন আগে মিডিয়া-মুঘল ট্রেড টার্নারের মৃত্য শোকাতুর করেছে বাংলাদেশের একমাত্র নোবেলজয়ী সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। তিনি শোকবার্তা পাঠিয়েছেন। যদিও তিনি গাজার গণহত্যা, কিম্বা ইরানের শিশুহত্যা নিয়ে নীরব ছিলেন। সাবেক এই প্রধান উপদেষ্টা ’২৪-এর জুলাই আন্দোলনের সময় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু এখন তাঁর বিরুদ্ধেই উঠেছে শিশুহত্যার অভিযোগ। ইউনূস সরকারের ইচ্ছাকৃত গাফিলতি এবং অবহেলার কারণে শতশত শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। ইউনূস নীরব। ইউনূস বা তাঁর নিত?্য সাথী সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম একটা দুঃখ প্রকাশ পর্যন্ত করেননি।
বাংলাদেশে হামে শত শত শিশুর মৃত্যু শুধু একটি স্বাস্থ্য বিপর্যয় নয়, এটি রাষ্ট্রের নৈতিক পতনেরও প্রতীক। যে রোগ পৃথিবীর বহু দেশে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, সেই হামে আজ বাংলাদেশে ৪০০-এর বেশি শিশু মারা গেছে। আক্রান্ত পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি। এই মৃত্যুগুলোকে ঠেকানো যেত। সত্যি বলতে, শিশুরা প্রকৃতির হাতে নয়, রাষ্ট্রের ব্যর্থতার হাতে মারা গেছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো- আন্তর্জাতিক সংস্থা UNICEF আগেই ইউনূস সরকারকে সতর্ক করেছিল। Measles vaccine procurement বা টিকা কেনার পদ্ধতি বদলালে, UNICEF-এর মাধ্যমে সরাসরি সংগ্রহ বন্ধ করে open tender system গেলে, টিকার সরবরাহে দেরি হবে, সংকটও তৈরি হবে। UNICEF-এর প্রতিনিধিরা অনুরোধ করেছিলেন- open tender system এর সিদ্ধান্ত না নিতে। কিন্তু সরকার শুনল না। ফল কী হলো? টিকার ঘাটতি, টিকাদান কর্মসূচির ভেঙে পড়া, তারপর মহামারির মতো হাম ছড়িয়ে পড়া। এই মৃত্যুগুলো কি তাহলে শুধুই ‘দুর্ভাগ্য’? নাকি প্রশাসনিক অবহেলার ফল? যে বাবা-মা এগারো বছর অপেক্ষা করার পর যমজ সন্তানের মুখ দেখলেন, তারপর হাম কেড়ে নিল একটি শিশুকে, আরেকটি হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে- তাঁদের কি প্রশ্ন করার অধিকার নেই? তাঁদের কি আদালতে যাওয়ার অধিকার নেই? তাঁরা যদি বলেন, ‘আমাদের সন্তানের মৃত্যু রাষ্ট্রের ব্যর্থতায়’- তাহলে কি সেটি অন্যায় হবে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতার জন্যই হামে শিশুমৃত্যুর বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে একটি শব্দ উচ্চারণ করছেন না আমাদের জাতির বিবেকরা। সুশীলরা এখন সংস্কার না করলে কী হবে সে বিষয়ে আমাদের সতর্ক করছেন। শোবিজ তারকারা ভীষণ ব্যস্ত বিশেষ গোষ্ঠীর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে নানা সাজে সজ্জিত হয়ে নিজেদের গ্ল্যামার প্রদর্শনীতে। যখন দেশের হাসপাতালগুলোতে শিশুদের কান্নায় এক শোকাবহ পরিবেশ। শিশুমৃত্যুর মিছিল বাড়ছেই। আদরের সন্তান হারিয়ে মা-বাবার কান্নায় যখন ভারী হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের বাতাস। তখন আমাদের সুশীলদের উপেক্ষা আর নীরবতা দেখে মনে হয়, আসলে এই অবুঝ শিশুরা চিরতরে চলে গিয়ে আমাদের জানিয়ে গেল যে, জাতির বিবেকরা পচে গেছে। আমাদের সুশীল সমাজ এবং সেলেব্রিটিরা আসলে পচা লাশ। যেখান থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে সারা দেশে। আমরা বাস করছি এক মানবিক বোধশূন্য সমাজে। অদিতি করিম : লেখক ও নাট্যকার
ইমেইল : auditekarim@gmail.com
