হুতির উত্থানে নিরুপায় সৌদি?
অনলাইন ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের উত্তাপ ও অস্থিতিশীলতার মধ্যে এবার নতুন করে গভীর সামরিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে সৌদি আরব। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের জেরে আঞ্চলিক অচলাবস্থা, অন্যদিকে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের লাগাতার হামলা ও আগ্রাসন; এ দুইয়ের জাঁতাকলে পড়ে চরম বেকায়দায় রয়েছে দেশটি। পরিস্থিতি সামাল দিতে রিয়াদ যখন ওয়াশিংটনের সহায়তা চেয়েছে, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তা নাকচ করে দিয়েছেন। ট্রাম্পের এই অনীহা এবং হুতির একের পর এক সামরিক অগ্রগতির কারণে সৌদি আরব এখন তাদের সামরিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত সীমিত বিকল্পের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
সৌদি আরবের ডি-ফ্যাক্টো শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বিগত কয়েক বছর ধরে একটি সংঘাতমুক্ত মধ্যপ্রাচ্য গঠনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল উগ্র রক্ষণশীল ইমেজ থেকে বের হয়ে সৌদি আরবকে বৈশ্বিক ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত করা এবং দেশটিতে ব্যাপক সামাজিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটানো। কিন্তু ২০২৩ সালে ইসরায়েলে হামাসের হামলা এবং পরবর্তীতে ইরান ও ইসরায়েল-আমেরিকা সংঘাত শুরু হলে সেই পরিকল্পনা বড় ধরনের ধাক্কা খায়। সংঘাতের জেরে পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, যা অঞ্চলটির তেল ও গ্যাস রপ্তানিকে পুরোপুরি স্থবির করে দেয়।
প্রথম দিকে সৌদি আরব পূর্বাঞ্চলীয় তেলক্ষেত্র থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরে তেল পাঠিয়ে হরমুজ প্রণালির সংকট এড়াতে পেরেছিল। এই বিকল্প পথ দিয়ে তারা সুয়েজ খাল বা বাবেল মান্দেব প্রণালি হয়ে ইউরোপ ও এশিয়ায় তেল রপ্তানি অব্যাহত রেখেছিল। কিন্তু গত জুলাই মাসে হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি জাহাজের ওপর অনানুষ্ঠানিক অবরোধ ঘোষণা করে এবং দীর্ঘ চার বছর পর আবারও বড় ধরনের আক্রমণ শুরু করলে পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে ওঠে। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে হুতি রিয়াদের বিরুদ্ধে তিন দিক থেকে হামলা জোড়দার করেছে। আগস্টের শেষে হরমুজ প্রণালীতে সৌদি তেল ট্যাঙ্কারে হামলা চালিয়ে দুই নাবিককে হত্যা করা হয়। এরপর হুতি লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দর ও উপকূলীয় দ্বীপ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়, যার ফলে বাবেল মান্দেব প্রণালী দিয়ে সৌদি শিপিং রুটের নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতে চলে যায়।
পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নেয় যখন ইরাক ভিত্তিক ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের ড্রোন হামলার কারণে সৌদি আরব তাদের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন বন্ধ করতে বাধ্য হয়। এটিই ছিল হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার মুহূর্তে লোহিত সাগরে তেল পৌঁছানোর একমাত্র মূল পথ। এই দ্বিমুখী হামলার সরাসরি প্রভাব পড়েছে জ্বালানি বাজারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে এশিয়ায় সৌদি আরবের দৈনিক তেল রপ্তানি ছিল প্রায় ৩৪ লাখ ব্যারেল, যা হুতি আক্রমণের ধাক্কায় আগস্টে নেমে আসে মাত্র ১ লাখ ২৮ হাজার ব্যারেলে। সম্প্রতি তা কিছুটা পুনরুদ্ধার হয়ে দিনে প্রায় ৭ লাখ ব্যারেলে পৌঁছালেও তা স্বাভাবিকের তুলনায় অত্যন্ত কম।
এমন সংকটময় মুহূর্তে সৌদি যুবরাজ ওয়াশিংটনের হস্তক্ষেপ আশা করেছিলেন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি ও সামরিক ছত্রছায়ায় ভরসা রেখে এসেছে। মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে হুতির বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তবে আসন্ন কংগ্রেস নির্বাচনের মুখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এমন একটি জটিল ও অচলাবস্থায় রূপ নেওয়া যুদ্ধে জড়াতে রাজি হননি। তা ছাড়া ইরানের সঙ্গে এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত চলছে, যার ফলে মার্কিন নৌবাহিনীর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে এবং তাদের গোলাবারুদের মজুতও কমছে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সরাসরি সামরিক অভিযানে যাওয়ার অনাগ্রহ রিয়াদের জন্য বড় ধরনের হতাশা নিয়ে এসেছে, যদিও ওয়াশিংটন সৌদিকে সামরিক গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে বলে জানা গেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের হাতে থাকা বিকল্পগুলো অত্যন্ত ঝুঁকি ও ব্যয়ে পূর্ণ। প্রথমত, সৌদি আরব যদি সামরিকভাবে আবার হুথিদের হটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে ইয়েমেন সংঘাতের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। এতে সৌদি জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হুথিদের সর্বাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আক্রমণ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। মার্কিন-ইরান উত্তেজনার কারণে সৌদির কাছে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহও এখন আগের চেয়ে সীমিত। অন্যদিকে, হুথি বা তাদের মূল নিয়ন্ত্রক ইরানের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজাও কঠিন। কারণ হুথিরা সৌদি অবরোধ সম্পূর্ণ তুলে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে, যা মেনে নিলে দীর্ঘমেয়াদে তারা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। আর তেহরানও ওয়াশিংটনের কাছ থেকে বড় কোনো ছাড় না পেলে অঞ্চলটি স্থিতিশীল করতে খুব একটা আগ্রহী নয়। ফলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের যে রূপকল্প রিয়াদ সাজিয়েছিল, তা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি
