২৪ কোটির প্রকল্পে ভ্রমণেই ৯ কোটি
ইমরান চৌধুরী
দেশের মানুষের সাক্ষরতার দক্ষতা, শিক্ষার মান, নাগরিক নিরাপত্তা, সুশাসন ও সরকারি সেবা সম্পর্কে জনধারণা জানতে জরিপ পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। এজন্য ‘লিটারেসি অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড সিটিজেন পারসেপশন সার্ভে’ নামে একটি প্রকল্পের প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ২৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। অথচ জরিপের জন্য প্রস্তাবিত এই প্রকল্পে ভ্রমণ ব্যয়েই বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৯ কোটি ৩৭ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ মোট প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশই ভ্রমণ খাতে। এর বাইরে পরিবহন, যাতায়াত ও জরিপ কার্যক্রমের জন্যও আলাদা বরাদ্দ রয়েছে।
এক খরচের চার হিসাব : প্রকল্পের ব্যয় প্রস্তাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভ্রমণ ব্যয়ের পাশাপাশি পরিবহন, যাতায়াত ও জরিপ কার্যক্রম ব্যয় পৃথক খাতে রাখা হয়েছে। ভ্রমণ ব্যয়ে ৯ কোটি ৩৭ লাখ ৬৬ হাজার টাকা, পরিবহন ব্যয়ে ১৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা, যাতায়াত ব্যয়ে ৩ লাখ টাকা এবং জরিপ কার্যক্রমে প্রায় ৫ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। এই চার খাতের সম্মিলিত ব্যয় ১৪ কোটি ৬২ লাখ ৪৬ হাজার টাকা, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৫৯ শতাংশ। চারটি খাতের উদ্দেশ্য ও ব্যয়ের ধরন কতটা পৃথক, একই কার্যক্রমের ব্যয় একাধিক খাতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
শুধু এই চার খাতেই প্রকল্পের অর্ধেকের বেশি অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। এর বাইরে প্রশিক্ষণ, সম্মানি, কম্পিউটার সামগ্রী কেনা, মেরামতসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে।
কম্পিউটার সামগ্রীতে দুই বরাদ্দ : প্রকল্পের ব্যয় প্রস্তাবে কম্পিউটার সামগ্রী কেনার জন্য ৫০ লাখ টাকা এবং ২৮ লাখ টাকার পৃথক বরাদ্দ দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি কম্পিউটার মেরামতের জন্য রাখা হয়েছে ৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ কম্পিউটারসংশ্লিষ্ট এই তিনটি খাতেই মোট ৮১ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৩ দশমিক ২৭ শতাংশ।
এখানে কম্পিউটার সামগ্রী খাতে ভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম কেনার পরিকল্পনা থাকলে তা ব্যয় বিভাজনে স্পষ্ট নেই। আর একই ধরনের সরঞ্জাম কেনার জন্য দুই জায়গায় বরাদ্দ রাখা হলেও তার ব্যাখ্যা নেই।
প্রশিক্ষণে ২ কোটি ২৭ লাখ, সম্মানিতে ৫৭ লাখ : জরিপ পরিচালনা ও তথ্য সংগ্রহের কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণের জন্য ২ কোটি ২৭ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে প্রকল্পে। এই অঙ্ক মোট প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। অন্যদিকে সম্মানি বাবদ ৫৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ২ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
কী উদ্দেশ্যে এই প্রকল্প : পরিকল্পনা বিভাগ ও আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সঙ্গে সম্পর্কিত এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো সাক্ষরতার প্রকৃত দক্ষতা মূল্যায়ন এবং নাগরিকদের বিভিন্ন বিষয়ে ধারণা ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা। প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রকল্পটি পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নে (এসডিজি) মানসম্মত শিক্ষা, শান্তি, ন্যায়বিচার ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত সূচকগুলোর তথ্য সংগ্রহ ও মূল্যায়ন করা হবে।
সাক্ষরতার ক্ষেত্রে শুধু পড়তে ও লিখতে পারার বিষয় নয়, বরং অর্জিত দক্ষতা কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, তা মূল্যায়নের লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি নাগরিক নিরাপত্তা, সুশাসন, দুর্নীতি, সরকারি সেবা, বৈষম্য, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্পর্কে মানুষের ধারণা জানার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা, সরকারি নীতি প্রণয়ন এবং এসডিজি-সংক্রান্ত অগ্রগতি মূল্যায়নে কাজে লাগানোর কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও এলাকার মধ্যে শিক্ষাগত দক্ষতা এবং নাগরিক অভিজ্ঞতার পার্থক্য চিহ্নিত করার মাধ্যমে নীতিনির্ধারণে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা পাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। প্রকল্প দলিলের সময়সূচিতে ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে কাজ শুরুর এবং ২০২৯ সালের জুনে শেষ করার পরিকল্পনা উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ প্রস্তাবিত মেয়াদ প্রায় আড়াই বছর। প্রকল্পের আওতায় জরিপ পরিচালনা, তথ্য সংগ্রহ, তথ্যের মান যাচাই, বিশ্লেষণ এবং প্রতিবেদন তৈরির কার্যক্রম সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। দলিলে অর্থবছরভিত্তিক প্রাক্কলিত ব্যয়ের ছকও রয়েছে। সেখানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১২১ কোটি ৪ লাখ টাকা, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ২ কোটি ২৪ লাখ ৪৬ হাজার টাকা এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৩ কোটি ৩১ লাখ ৪৯ হাজার টাকা ব্যয়ের হিসাব দেখানো হয়েছে। সব মিলিয়ে মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ২ হাজার ৪৭৭ লাখ টাকা বা ২৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। প্রকল্পটির পুরোপুরি অর্থায়ন হবে সরকারি অর্থে (জিওবি)।
