অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ভার্সন
অলস ফেলে রাখা যন্ত্রপাতির কান্না
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে মূল্যবান যন্ত্রপাতি
১৫ আগস্ট ২০২৬, শনিবার। সকাল সোয়া ১১টা। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বঙ্গোপসাগরের পারে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। সাগরে তখন ভাটা। পানি দূরে সরে গেছে। কিনারায় জেগে ওঠা বালু রোদে চিকচিক করছে।
সমুদ্রের এই পারেই বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। বেড়িবাঁধ ধরে কিছুটা এগিয়ে বাঁয়ে ১১ নম্বর গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে একের পর এক বিশাল স্থাপনা। কোথাও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে স্টিলের কাঠামো, কোথাও সারি সারি যন্ত্রপাতি। তবে সমুদ্রের মতো এখানেও যেন ভাটা।
পার্থক্য একটাই, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সমুদ্রের ভাটা কেটে জোয়ার ফিরেছে। অথচ এই কারখানায় ভাটা চলছে প্রায় দুই বছর ধরে। এখানে জোয়ার ফেরার কোনো লক্ষণ নেই।
বিশাল একটি স্টিলের কাঠামোর নিচে গিয়ে দেখা যায়, রেললাইনের মতো ট্র্যাকের ওপর ঠায় দাঁড়িয়ে আছে একটি লেডেল কার। প্রায় ৩০ টন ওজনের এই কারের কাজ লেডেল ভর্তি গলিত ইস্পাত নিয়ে উৎপাদনপ্রক্রিয়ার এক ধাপ থেকে আরেক ধাপে ছুটে যাওয়া।
অথচ যে ট্র্যাকে তার ছুটে চলার কথা, সেখানে তার প্রথম যাত্রাই হয়নি। চার বছর ধরে একই জায়গায় পড়ে আছে। ফলে মাথার ওপরের বিশাল কাঠামোটি সত্যিকার অর্থেই আজও নিষ্প্রাণ।
উপস্থিত প্রকৌশলীদের তথ্য মতে, লেডেল কারটি ২৫ মিটার পথ একবার ঘুরে এলে উৎপাদন হবে অন্তত ১০০ টন স্টিল। দিনে কমপক্ষে ৪০ বার এই ট্র্যাকে ঘুরে অন্তত চার হাজার টন স্টিল উৎপাদন হওয়ার কথা।
প্রস্তুত হয়েও কেন ঘোরেনি এই লেডেল কারের চাকা—সরেজমিনে দেখা এই স্থবিরতার নেপথ্য অনুসন্ধানে গিয়ে হাত আসে বেশ কিছু নথিপত্র। সেগুলো পর্যালোচনা করে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এমন কিছু সরকারি সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া গেছে, যেগুলো ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে একের পর এক বড় শিল্প প্রকল্পের অর্থায়ন ও উৎপাদন কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া কিছু সিদ্ধান্ত তাঁদের স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমকে এমনভাবে সীমিত করেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে উৎপাদন ও নতুন শিল্প প্রকল্পে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু একরোখা সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংকঋণ, ঋণ পুনঃতফসিল, এলসি, কাঁচামাল আমদানি এবং বড় প্রকল্পের সিন্ডিকেট ঋণপ্রাপ্তিতে জটিলতা তৈরি হয় বলে তাঁদের দাবি। এর নেপথ্যে তৎকালীন গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের হাতও রয়েছে বলে অভিযোগ আছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সংকট শুধু এই একটি স্টিল কারখানায় সীমাবদ্ধ নয়, বসুন্ধরাসহ কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর বহু প্রকল্প একই সময়ে আর্থিক ও নীতিগত প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও কিংবা ঢাকার পূর্বাচলের কাছাকাছি বসুন্ধরা গ্রুপের নির্মিত ও নির্মীয়মাণ কয়েকটি বড় শিল্প প্রকল্প
ঘুরে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কোনো প্রকল্প শতভাগ প্রস্তুত হয়েও উৎপাদনে যেতে পারেনি, কোনোটি আটকে আছে নির্মাণের শেষ পর্যায়ে। আবার আগে থেকেই উৎপাদনে থাকা কয়েকটি কারখানা চলছে সক্ষমতার অনেক নিচে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এসব প্রকল্পে বিনিয়োগ হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। এগুলো পুরোদমে চালু হলে প্রত্যক্ষভাবে ২০ থেকে ২৫ হাজারসহ সব মিলিয়ে অন্তত এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারত। উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন পণ্যের আমদানিনির্ভরতাও কমে আসত। এতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ার পাশাপাশি সাশ্রয় হতে পারত বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা।
মেশিন ও মানুষের কোলাহলের বদলে সুনসান নীরবতা : মিরসরাইয়ের জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৯০ একর জায়গাজুড়ে সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবালের মালিকানাধীন বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ। বিশাল শেড, উৎপাদন ইউনিট, উঁচু স্টিলের কাঠামো আর সারি সারি যন্ত্রপাতি—সব মিলিয়ে ভারী শিল্পের এক বিশাল অবকাঠামো। সাগরপারে দাঁড়িয়ে মনে হয়, ভেতরে বুঝি ইস্পাত তৈরির মহাসমারোহ চলছে।
কিন্তু কাছে যেতেই ভাবনার সঙ্গে বাস্তবের মিল পাওয়া গেল না। সেখানে দেখা দিল এক অলস-নিষ্প্রাণ লোহার বহর। এখানে গলিত ইস্পাত থেকে চ্যানেল, অ্যাঙ্গেলসহ আধুনিক কনস্ট্রাকশন বা নির্মাণশিল্পে ব্যবহৃত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন স্টিলের তার ও রড তৈরির কথা। কিন্তু উৎপাদনের কোনো তোড়জোড় নেই। শ্রমিকদের কোলাহলের বদলে চারপাশে সুনসান নীরবতা।
এখান থেকে বেরিয়ে একটু এগোতেই খোলা আকাশের নিচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায় বিপুল পরিমাণ ভারী যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ। এর মধ্যে রয়েছে স্ক্র্যাপ শিয়ারিং মেশিন, ওভারহেড ক্রেন, লেডেল, রোল স্ট্যান্ড, এফটিপি, এলআরপিসি ইকুইপমেন্ট, ট্রান্সফরমার, মেকানিক্যাল হাইড্রোলিকস, ইলেকট্রিক্যাল ড্রাইভ ও মোটর এবং অটোমেশন প্যানেল।
একরের পর এক জায়গা ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে। কোনো যন্ত্র নীল রঙের ত্রিপলে মোড়ানো, তো কোনোটা কাঠের বাক্সে আবৃত। রোদে, জলে, বৃষ্টিতে ভিজে অনেক ত্রিপল ছিঁড়ে ঝুলে গেছে। ভেঙেচুরে গেছে কাঠের বাক্স। যন্ত্রের আবরণ বদলে গেছে প্রায়ই। কোথাও মরিচাও জমেছে।
প্রকল্পটির ঊর্ধ্বতন প্রধান প্রকৌশলী শেখ মোহাম্মদ রেজওয়ানুল ফেরদৌস লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মাথা নাড়িয়ে ভারী গলায় বললেন, ‘ঠিক সময়ে উৎপাদনে যেতে পারলে এই যন্ত্রপাতিগুলো এখানে পড়ে থাকত না।’
উৎপাদন ইউনিটের দিকে হাত বাড়িয়ে তিনি বলেন, ‘এগুলোর থাকার কথা ওই কাঠামোটার নিচে। যন্ত্রপাতিগুলো সংযোজিত হলে সেখানে চাকা ঘুরত। মেশিন আর মানুষে পুরো এলাকা গমগম করে উঠত। স্টিলের নানা ধরনের পণ্য উৎপাদিত হতো। আর এটি হতো উৎপাদিত পণ্যের মজুত ভাণ্ডার এবং শ্রমিকের কোলাহলপূর্ণ এলাকা।’
তিনি আরো বলেন, প্রায় ২২ একরের এই অংশটি মূলত স্ক্র্যাপ স্টোরেজ। উৎপাদন শুরু না হওয়ায় যন্ত্রপাতিগুলো অপেক্ষায় পড়ে আছে। মান ঠিক রাখতে শুধু ত্রিপল কিনতেই প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। কিন্তু খোলা আকাশের নিচে হওয়ায় ত্রিপল বা ইনস্যুলেশন পেপার বারবার নষ্ট হচ্ছে।
প্রকৌশলীদের তথ্য অনুযায়ী, কারখানাটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২১ সালে। জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে এটিই সবচেয়ে বড় বিনিয়োগের প্রকল্প। বছরে সাড়ে ১২ লাখ টন ইস্পাত উৎপাদনের লক্ষ্য ছিল। একক ইউনিট হিসেবে উৎপাদন সক্ষমতার দিক থেকে দেশের সবচেয়ে বড় কারখানা হওয়ার কথা। কিন্তু উৎপাদন শুরু না হওয়ায় এখানে প্রায় ১৯ হাজার টন মেশিন এবং ২০ হাজার টন স্ট্রাকচার কার্যত অলস পড়ে আছে।
প্রকৌশলীর সঙ্গে আলাপ করতে করতে আমরা যতটা পথ ঘুরে দেখছি, ততই বিস্মিত হচ্ছি। দুই বছর আগেই উৎপাদনে যাওয়ার কথা, তাই তারও আগে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল এনে রাখা হয়েছিল। সেখানে এখন আগাছা উঠেছে; লতা বেয়ে উঠছে যন্ত্রপাতির গায়ে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের প্রথম এই গ্রিন স্টিল প্লান্টটিকে টুঁটি চেপে ধরলেও একই সময়ে উৎপাদনে চলে গেছে পাশেই অবস্থিত একটি বিদেশি কারখানা।
সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, দেশে বছরে প্রায় ৭৫ লাখ টন ইস্পাতপণ্যের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে উৎপাদনে থাকা মানসম্মত কারখানাগুলোয় ৪০ থেকে ৪৫ লাখ টন গ্রেডেড স্টিল উৎপাদিত হয়। বাকি চাহিদার একটি অংশ পূরণ হচ্ছে ছোট ও অনিয়ন্ত্রিত কারখানা থেকে। এসব কারখানায় নন-গ্রেডেড স্টিল উৎপাদিত হয়।
২০২৪ সালের মাঝামাঝি অথবা শেষ দিকে কারখানাটি উৎপাদনে যাওয়ার পূর্ণ প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রোষানলে পড়ে সম্ভাবনাময়ী প্রকল্পটি থমকে যায়। ফলে কারখানার চাকা ঘোরেনি, উৎপাদনও হয়নি। উল্টো ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে কম্পানিকে।
প্রাথমিকভাবে এর ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় চার হাজার ১৬০ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, প্রত্যক্ষভাবে প্রায় সাত হাজার এবং পরোক্ষভাবে অন্তত এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারত এখানে। গ্রুপের হিসাবে, পূর্ণ উৎপাদনে গেলে বছরে সরকারের রাজস্ব আয় হতে পারত প্রায় দেড় হাজার থেকে দুই হাজার কোটি টাকা।
কারখানাটির জন্য আমদানি করা প্রায় ৫৩৪ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি বন্দরে আটকে থাকার কথা জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। তাঁদের দাবি, সময়মতো পণ্য খালাস করতে না পারায় ডেমারেজসহ বিভিন্ন খাতে দায় জমেছে প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা।
টাকা প্রস্তুত, তবু ছাড় হয়নি যন্ত্রপাতি : হাতে আসা নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, মিরসরাইয়ের এই প্রকল্পের জন্য ২০২২ সালের শুরুতে ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানির এলসি খোলা হয়েছিল। তখন প্রতি ডলারের বিনিময়মূল্য ছিল ৮৪ থেকে ৮৬ টাকা। এলসিগুলো কনফার্মড হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ২০২২ ও ২০২৩ সালের মধ্যেই বিদেশি সরবরাহকারীদের সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ডলারের দাম প্রায় ১২০ টাকায় পৌঁছলে একই যন্ত্রপাতির স্থানীয় মুদ্রামূল্য প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে যায়।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের শুরুতে নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া এসব এলসির বিপরীতে মুদ্রার অবমূল্যায়নজনিত ঘাটতি পূরণে বিএমএসআইএলের কাছে এককালীন প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা দাবি করে ব্যাংক। তখন প্রকল্পটি নির্মীয়মাণ থাকায় এর কোনো আয় ছিল না। অনুমোদিত ঋণ সুবিধার আওতায় অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনের সুযোগও দেওয়া হয়নি। ফলে এই অর্থ সংগ্রহ করতে কম্পানিটির প্রায় এক বছর লেগে যায়।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে বিএমএসআইএল ৮৫০ কোটি টাকা পরিশোধের ব্যবস্থা করে। মূল শিপিং ডকুমেন্ট বুঝিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ব্যাংককে অর্থ পরিশোধের প্রস্তাবও দেওয়া হয়। ওই ডকুমেন্ট ছাড় হলে চট্টগ্রাম বন্দরে থাকা যন্ত্রপাতি খালাস করে কারখানায় সংযোজন করা সম্ভব হতো। কিন্তু এর পরের মাসেই নতুন এক নির্দেশনায় পরিস্থিতি পাল্টে যায়।
নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘বসুন্ধরা’ নামযুক্ত সব প্রতিষ্ঠানকে একক ঋণগ্রহীতা হিসেবে বিবেচনার নির্দেশ দেয়। এরপর সিন্ডিকেটেড ঋণের লিড অ্যারেঞ্জার অগ্রণী ব্যাংক জানায়, শিপিং ডকুমেন্ট ছাড় করলে একক ঋণগ্রহীতার বিপরীতে তাদের ঋণ এক্সপোজার বেড়ে যাবে। একই অবস্থান নেয় সিন্ডিকেটের অন্য ব্যাংকগুলোও। ফলে বিদেশি সরবরাহকারীরা অর্থ পেয়ে গেলেও এবং বিএমএসআইএলের হাতে দাবীকৃত টাকা প্রস্তুত থাকলেও যন্ত্রপাতি খালাসের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ব্যাংকেই আটকে থাকে।
প্রকল্প কর্মকর্তাদের দাবি, বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) রেকর্ডে বিএমএসআইএলকে অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে পৃথক একটি কম্পানি হিসেবে দেখানো হয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো আর্থিক দায়ও সেখানে দেখানো হয়নি। পৃথক সত্তার প্রমাণ হিসেবে আইনি নথি, মালিকানার রেকর্ড ও পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল।
অবশেষে ২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রায় ১৩ মাস পর, সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক অগ্রণী ব্যাংককে বিএমএসআইএলকে আগের নির্দেশনার বাইরে পৃথকভাবে বিবেচনার নির্দেশ দেয়। কিন্তু তত দিনে বন্দরে থাকা যন্ত্রপাতির ডেমারেজ ও কনটেইনার ডিটেনশন বহুগুণ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে চলতে থাকে ঋণের সুদ। যে যন্ত্রপাতি উৎপাদন শুরু করে কম্পানির আয় তৈরির কথা ছিল, সেগুলোই উল্টো প্রতিদিন নতুন দায় তৈরি করতে থাকে।
প্রকল্পটির জন্য অগ্রণী ব্যাংকের নেতৃত্বে আটটি ব্যাংকের কনসোর্টিয়াম দুই হাজার ৩৫০ কোটি টাকার সিন্ডিকেটেড টার্ম লোন অনুমোদন করেছিল। নথি অনুযায়ী, এর মধ্যে ছাড় হয়েছে মাত্র ৫৭৬ কোটি টাকা বা ২৪.৫১ শতাংশ। বাকি এক হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা ছাড় না হওয়ায় নির্মাণের শেষ পর্যায়ে এসে প্রকল্পটির অর্থায়ন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বিদেশি সরবরাহকারীর অর্থ আগেই পরিশোধ করা হয়েছে। কম্পানিও ব্যাংকের দাবীকৃত অর্থ প্রস্তুত রেখেছিল। অথচ শিপিং ডকুমেন্ট ছাড় না হওয়ায় যন্ত্রপাতি বন্দরে পড়ে থেকেছে। সেখানে প্রতিদিন ডেমারেজ বেড়েছে, অন্যদিকে ঋণের সুদও চলেছে।’
কোথা থেকে শুরু এই অচলাবস্থা : একের পর এক শিল্প প্রকল্প কেন থমকে গেল, এর নেপথ্য কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে সামনে আসে ২০১৭ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। হাতে আসা সংশ্লিষ্ট একটি নথিতে দেখা যায়, ওই বছরের মার্চে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের পর বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবসা পাঁচটি পৃথক করপোরেট কাঠামোতে পরিচালিত হতে শুরু করে। এগুলো হলো—বসুন্ধরা গ্রুপ (বিজি), তানভীর বসুন্ধরা গ্রুপ (টিবিজি), সানভীর বসুন্ধরা গ্রুপ (এসবিজি), আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপ (এবিজি) এবং সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবাল (এসবিজি)।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এ পৃথককরণই কার্যত উপেক্ষা করতে শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। পৃথক পাঁচটি করপোরেট কাঠামোর ঋণ, দায় ও সম্পদ সম্মিলিতভাবে বিবেচনা করা হয়। এতে একক ঋণগ্রহীতার ঋণসীমা, ক্রেডিট রেটিং এবং নতুন ঋণ ও এলসি সুবিধায় বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়।
পরিস্থিতি আরো জটিল হয় পরবর্তী কয়েকটি সিদ্ধান্তে। গ্রুপসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, একটি ব্যাংকে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার ঋণ পুনঃ তফসিলের আবেদন নাকচ হয়, নতুন ঋণসুবিধা সীমিত হয়ে পড়ে এবং গ্রুপ ও মালিকপক্ষের কিছু ব্যাংক হিসাবও স্থগিত করা হয়। একের পর এক এসব সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসে পড়ে এলসি খোলার ক্ষেত্রে।
বসুন্ধরা গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যাংকিং সিদ্ধান্ত ছিল না। তাঁদের ভাষ্য, সাধারণ ব্যাংকিং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আড়ালে ধারাবাহিকভাবে এমন সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত গ্রুপটির স্বাভাবিক অর্থায়ন ও আমদানি কার্যক্রম সংকুচিত করে দেয়। তাঁদের অভিযোগের তীর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় এবং বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের দিকে।
কবে ঘুরবে মেশিনের চাকা : মিরসরাই থেকে ফেরার সময় বঙ্গোপসাগরে তখন জোয়ার ফিরেছে। সকালে যে বালুচর জেগে ছিল, তার অনেকটাই আবার পানির নিচে। কিন্তু বেড়িবাঁধের অন্য পাশে দৃশ্য বদলায়নি। ৩০ টনের লেডেল কারটি তখনো ঠায় দাঁড়িয়ে একই ট্র্যাকে। নীরব বিশাল উৎপাদন ইউনিট, খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকা যন্ত্রপাতিও অপেক্ষায়।
চলতি পথে কথা হয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে একটি কারখানায় কর্মরত একজন কর্মকর্তার সঙ্গে। চল্লিশোর্ধ্ব আলমগীর হোসেন বলেন, কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে অবশ্যই তদন্ত হওয়া উচিত। কিন্তু যদি উৎপাদনের চাকা থামিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে শুধু দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, স্থানীয়রা নতুন কর্মসংস্থান থেকেও বঞ্চিত হয়।
আলমগীর বলেন, মিরসরাইয়ের বহু মানুষ বেকার। জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পর এখানকার মানুষ নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু বসুন্ধরার কারখানাগুলোকে যেভাবে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে, তাতে স্থানীয়রাও হতাশ। এসব কারখানা চালু হলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ত।
আলমগীরের সঙ্গে আলাপ শেষে আমরা ফিরতি পথ ধরি। পেছনে পড়ে থাকে সমুদ্র আর বিশাল শিল্পাঞ্চল। সাগরের ভাটা ততক্ষণে কেটে গেছে। এখন অপেক্ষা, কারখানাগুলোর ভাটা কাটবে কবে, কবে ঘুরবে মেশিনের চাকা।
