ভূমিজ সম্প্রদায়ের প্রথম স্নাতক অঞ্জন
সৈয়দ বয়তুল আলী, মৌলভীবাজার
বাংলাদেশে বসবাসকারী ‘ভূমিজ’ একটি আদিবাসী সম্প্রদায়। তাদের পূর্ব পুরুষরা ভূমির কাজ করতেন বলে নাম হয়েছিল ভূমিজ বা ভূমির সন্তান। শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা এ সম্প্রদায়ের কেউ এতদিন স্নাতক পাস করতে পারেননি। চলতি বছর প্রথম স্নাতক পাস করলেন অঞ্জন ভূমিজ নামে তাদেরই এক তরুণ। তিনি মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার ফুলতলা চা বাগানের এলবিন টিলা অংশের শ্রমিকের সন্তান।
অঞ্জন জানান, ভূমিজ সম্প্রদায় থেকে অতীতে কেউ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করা তো দূরের কথা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতাও অর্জন করেননি। অঞ্জন ফুলতলা বশির উল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৪ সালে এসএসসি পাস করে তৈয়বুনেচ্ছা খানম সরকারি কলেজে ভর্তি হন। এসএসসিতে পয়েন্ট ছিল ৪.১৩।
অঞ্জন আরও বলেন, ‘আমি যখন স্কুলে পড়ালেখা করেছি, তখন শুদ্ধ বাংলা জানতাম না। আমাদের নিজস্ব ভাষা মুন্ডারি ভাষায় কথা বলতাম। বন্ধুরা মজা করে আমাকে বলত, তুই বাংলায় প্রাইভেট পড়া শুরু কর। এইচএসসি পাস করে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে চান্স পাই। সেখানে আমার বিষয় ছিল পদার্থবিজ্ঞান। সেখান থেকে আমি ই গ্রেড পেয়ে অনার্স সম্পন্ন করেছি। বর্তমানে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত’। অঞ্জন লেখাপড়ার পাশাপাশি টিউশনি করেন। টাকা দেওয়ার মতো তেমন অবস্থা ছিল না তার পরিবারের। তাই টিউশনি করে লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করতেন। পাশাপাশি সামাজিক সংগঠন জালালাবাদ ছাত্রকল্যাণ সমিতিতে সক্রিয় আছেন। এর মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে অংশ নেন। এখন সংগঠনটির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির দায়িত্বে আছেন। মা-বাবা, দুই বোন মিলে তাদের পাঁচ সদস্যের পরিবার। অঞ্জন স্মৃতিচারণা করেন, ‘আমি যখন স্কুলে যেতাম, তখন জুতা তো দূরের কথা স্যান্ডেলও অনেক সময় পায়ে দিতে পারিনি। বাবা বলতেন, পড়ালেখা করে কী করবি? বাগানের ছেলে বাগানেই কাজ করতে হবে। অনেক সময় বলতেন পড়ালেখা কর, যদি ভালোভাবে লেখাপড়া করতে পার তাহলে বাগানে কাজ করতে হবে না। মা-বাবা বাগানের শ্রমিক। তারা নিরক্ষর। শুধু তারা নয়, এই সম্প্রদায়ের প্রায় সবাই নিরক্ষর। লেখাপড়া নিয়ে ইতিবাচক ধারণা নেই তাদের।’ ভূমিজ সম্প্রদায় নিয়ে অনেক স্বপ্ন অঞ্জন ভূমিজের। বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়ার পরই এ সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে প্রচারণা শুরু করেন। তার পরই এ সম্প্রদায়ের আরও ছয়জন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। অনেককেই কলেজের আবেদন করে দিয়েছেন অঞ্জন। তারা এখন অনার্সে পড়ছেন। এক সময় অনলাইনে চা বাগানের ছাত্রছাত্রীদের জন্য ফ্রি অনলাইন ক্লাস চালু করেছিলেন অঞ্জন। ভূমিজ সম্প্রদায়ের জন্য আশীর্বাদ বয়ে আনবে এমন কিছু করার পরিকল্পনা রয়েছে তার।
