পাঁচ ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা যেভাবে হাতিয়েছে বেক্সিমকো

মাহবুব মমতাজী
নিজেদের মধ্যে লেনদেন করে পাঁচ ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে বেক্সিমকো গ্রুপের দুটি কোম্পানির বিরুদ্ধে। এ কোম্পানি দুটি হলো বেক্সিমকো লিমিটেড এবং বেক্সটেক্স গামের্ন্টস। এই দুই প্রতিষ্ঠান ২০১১ সালে রাষ্ট্রীয় খাতের সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসরকারি খাতের এক্সিম ব্যাংকে ছয় শ কোটি টাকার ঋণপত্র খোলে। পরে সুদাসলে তা হাজার কোটি ছাড়িয়ে যায়। ফলে এ ব্যাংকগুলো তখনই বিপদে পড়ে যায়।

বেক্সিমকোর অন্যতম কর্ণধার সালমান এফ রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের নথি তলব করে দুদক ৭০টি সংস্থায় চিঠি দিয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্র জানায়, সেই সময়ে অনিয়মের তথ্য দুদক সংগ্রহ করে। কিন্তু শেখ হাসিনা সরকারের বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের ক্ষমতার প্রভাবে তখন কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি সংস্থাটি। ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে স্থানীয় এলসি (ঋণপত্র) খুলে বেক্সিমকো গ্রুপের ওই দুই কোম্পানির মধ্যে বাণিজ্য হয়। সুতা বিক্রেতা বেক্সটেক্সের হয়ে সোনালী ব্যাংক, আর বেক্সিমকো লিমিটেডের হয়ে জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও এক্সিম ব্যাংক ক্রয়মূল্য পরিশোধের স্বীকৃতি (এলসি এক্সসেপটেন্স) দেয়। এই স্বীকৃতি ধরেই সোনালী ব্যাংক থেকে এসব টাকা বের করে নেওয়া হয়। এর মধ্যে ২০১১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদোত্তীর্ণ হয় প্রায় সাড়ে ৬০০ কোটি টাকা। পরে আরও বেশ কয়েকটি স্থানীয় এলসির অর্থও পরিশোধ করেনি বেক্সিমকো লিমিটেড। সব মিলিয়ে কোম্পানি দুটি হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ হাতিয়ে নেয়।

সালমান এফ রহমান এবং তার পরিবারের অন্য সদস্যদের মালিকানাধীন ১৭ প্রতিষ্ঠানের ঋণসহ সংশ্লিষ্ট নথিপত্র তলব করে গতকাল চিঠি দিয়েছে দুদক। তার বিরুদ্ধে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণপূর্বক আত্মসাৎসহ হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। দুদক সূত্র জানায়, কাগজপত্রে বেক্সিমকো গ্রুপের দুই কোম্পানির লেনদেনের তথ্য-উপাত্ত ছিল ব্যাংকগুলোতে। কিন্তু বেক্সিমকো লিমিটেড বেক্সটেক্সের কাছ থেকে সুতা কিনেছে কি না, তার তথ্য ছিল না। ব্যাংকগুলোর ওই অর্থের একটা বড় অংশ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা হয়। অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট দুদক কর্মকর্তারা জানান, বেক্সিমকো লিমিটেড স্থানীয় মুদ্রায় আমদানি এলসি (ঋণপত্র) খুলেছে জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও এক্সিম ব্যাংকে। তার বিপরীতে বেক্সটেক্স সোনালী ব্যাংক থেকে বিক্রয় এলসি পাঠিয়েছে (অর্থের নিশ্চয়তা চেয়ে) উল্লিখিত চার ব্যাংকের কাছে। চার ব্যাংক বেক্সিমকো লিমিটেডের পক্ষে এই অর্থপ্রাপ্তিতে স্বীকৃতি অনুসারে বেক্সটেক্সকে অর্থ পরিশোধও করে দিয়েছে। কিন্তু এই চার ব্যাংক আর সোনালী ব্যাংকের অর্থ পরিশোধ করেনি। স্থানীয় এসব এলসির মেয়াদ ১৮০ দিনের। তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা যায়-একটি ব্যাংকে ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারির বিভিন্ন সময়ে এই এলসিগুলো খোলা হয়েছিল। অর্থাৎ আগস্ট মাসের বিভিন্ন সময় এই এলসিগুলোর মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়।
জানা যায়, ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিরোধ নিষ্পত্তি চেয়ে সোনালী ব্যাংক একটি চিঠি দেয়। ওই চিঠিতে তারা জানিয়েছিল- ২০১১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের মেয়াদোত্তীর্ণ পাওনার পরিমাণ হচ্ছে ৬৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে জনতা ব্যাংকের কাছে ১৪টি এলসির স্বীকৃতির বিপরীতে তাদের পাওনা প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের কাছে সাতটি এলসিতে তাদের পাওনা ১০৯ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংকের নয়টি এলসির স্বীকৃতির বিপরীতে তাদের পাওনা ৭৫ কোটি টাকা এবং এক্সিম ব্যাংকের স্বীকৃতি দেওয়া পাঁচটি এলসির বিপরীতে তাদের পাওনা তখন দাঁড়িয়েছিল ১১১ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সোনালী ব্যাংকের লিখিত ৬৪৫ কোটি টাকার দাবি নিষ্পত্তির চেয়েও বেশি অঙ্কের মেয়াদোত্তীর্ণ অর্থ আটকা পড়ার তথ্যও তখন পাওয়া যায়।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর রপ্তানি বাণিজ্যের আড়ালে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা (৮৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) বিদেশে পাচারের অভিযোগে বেক্সিমকো গ্রুপের সালমান এফ রহমানসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

সংস্থাটির বিশেষ পুলিশ সুপার আজাদ রহমান জানান, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও বিধি অনুযায়ী পরিচালিত সিআইডির অনুসন্ধানে বেক্সিমকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান, তার ভাই বেক্সিমকো গ্রুপের চেয়ারম্যান এ এস এফ রহমানের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়। বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ও বেনামে প্রায় ৩৩ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বিদেশে পাচার এবং অন্যান্য আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে পৃথক অনুসন্ধান শুরু করেছে সিআইডি।

সালমান পরিবারের নথি তলবে ৭০ সংস্থায় দুদকের চিঠি : সালমান এফ রহমান এবং তার পরিবারের অন্য সদস্যদের মালিকানাধীন ১৭ প্রতিষ্ঠানের ঋণসহ সংশ্লিষ্ট নথিপত্র তলব করে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণপূর্বক আত্মসাৎসহ হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। গতকাল দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে সংস্থাটির উপ-পরিচালক ও অনুসন্ধান টিম প্রধান মো. মনজুর আলম ওই তলবি চিঠি দিয়েছেন বলে জানা গেছে। চিঠিতে ৬৩টি সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, রাজউক, গণপূর্ত ও রেজিস্ট্রারসহ বিভিন্ন দপ্তরে পৃথক পৃথক চিঠিতে নথিপত্র তলব করা হয়েছে, যা আগামী চার কর্মদিবসের মধ্যে পাঠানোর অনুরোধ করা হয় চিঠিতে। চিঠিতে বলা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা ও চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান, তার ছেলে আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমানের ব্যক্তিগত নথিপত্র এবং বেক্সিমকো ও এর সহযোগী ১৭ প্রতিষ্ঠান অ্যাডভেঞ্চার গার্মেন্টস লিমিটেড, অ্যাপোলো অ্যাপারেলস লিমিটেড, অটাম লুপ অ্যাপারেলস লিমিটেড, বেক্সটেক্স গার্মেন্টস লিমিটেড, কসমোপলিটান অ্যাপারেলস লিমিটেড, কোজি অ্যাপারেলস লিমিটেড, এসেস ফ্যাশন লিমিটেড, ইন্টারন্যাশনাল নিটওয়্যার অ্যান্ড অ্যাপারেলস লিমিটেড, কাঁচপুর অ্যাপারেলস লিমিটেড, মিডওয়েস্ট গার্মেন্টেস লিমিটেড, পিয়ারলেস গার্মেন্টস লিমিটেড, পিঙ্ক মেকার গার্মেন্টস লিমিটেড, প্ল্যাটিনাম গার্মেন্টস লিমিটেড, স্কাইলেট অ্যাপারেলস লিমিটেড, স্প্রিংফুল অ্যাপারেলস লিমিটেড, আরবান ফ্যাশন লিমিটেড ও উইন্টার স্প্রিন্ট গার্মেন্টস লিমিটেডের নিজ ও যৌথ নামে ব্যাংক হিসাব, সঞ্চয়পত্র, ডিপিএস, ঋণ ক্রেডিট কার্ড ইত্যাদি নথিপত্র পাঠাতে হবে। এর আগে সালমান এফ রহমান ও তার পরিবারের অন্য সদস্যদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ সংক্রান্ত যাবতীয় নথিপত্র তলব করে গত ২৩ সেপ্টেম্বর ৮ ব্যাংককে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। এর কিছু নথিপত্র দুদকে এসেছে বলে জানা গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights