হৃদরোগীর ডেঙ্গু হলে করণীয়

ডা. মাহবুবর রহমান
ফের মারাত্মক রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। প্রতিদিন বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী। এমনকি বাড়ছে প্রাণহানিও। চলতি মাসে (জুন) প্রতিদিন ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আগের দিনের চেয়ে বাড়ছে। এমনকি এ বছরের মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত প্রতি মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে তার আগের মাসের চেয়ে দ্বিগুণ হারে। এ বছরের জুন মাসের প্রথম ১৫ দিন যতজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, তা আগের পুরো মাসের আক্রান্তের প্রায় সমান।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঘন ঘন ও থেমে থেমে বৃষ্টি এবং প্রায় সময়ই বাতাসের আর্দ্রতার আধিক্য ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে অনেকটাই ভাবিয়ে তুলছে। অবনতি হচ্ছে ডেঙ্গু পরিস্থিতির। হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর সংখ্যাও। পরিসংখ্যান ও রোগীর সংখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, এবার রাজধানীর চেয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে ডেঙ্গু বিস্তারের পরিমাণ বেশি। রাজধানী ঢাকাতে মশা নিধন ও প্রতিরোধের জন্য কম বেশি হলেও ব্যবস্থা আছে, কিন্তু জেলা শহরগুলোতে নেই বললেই চলে। তাই ডেঙ্গু নিয়ে এবার শঙ্কাও বেড়ে যাচ্ছে। ডেঙ্গু ভাইরাস কেবল এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। আমরা এর জীবনচক্র পরিষ্কার করে জানি। একটি ক্ষুদ্র গণ্ডির ভিতর এর চলাফেরা। অতএব এর জীবনচক্র রুখে বা ভেঙে দেওয়া মোটেই কঠিন না। এডিস মশা পরিষ্কার পানিতে জন্মলাভ এবং বংশবিস্তার করে। তাই আমরা যদি পণ করি এবং জেদ ধরি যে, আমরা সবাই এডিস মশার বংশবিস্তারের ক্ষেত্রগুলো ধ্বংস করব তাহলে এটা সম্ভব। সবার সচেতন প্রয়াস এটি সম্ভব করবে। একটু সচেতনতাই পারে ডেঙ্গুকে নির্মূল করতে। আসুন আমরা যার যার বাড়ির এডিসের প্রজনন ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করে এখনই ধ্বংস করি।

ডেঙ্গু মৌসুমে কারো জ্বর হলে সেটা গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। ঘরে বসে অপেক্ষা না করে চিকিৎসককে দিয়ে নিশ্চিত হতে হবে। সামান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই ডেঙ্গু রোগ নির্ণয় করা সম্ভব। তীব্র জ্বরের সঙ্গে প্রচণ্ড মাথা ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, সারা শরীর ব্যথা, মেরুদণ্ড ব্যথা, খাবারে অরুচি ও বমি এসব ডেঙ্গুর লক্ষণ। সাধারণত চার-পাঁচ দিন একটানা জ্বর শেষে হঠাৎ জ্বর কমে যায় এবং পঞ্চম বা ষষ্ঠ দিনে গায়ে লাল লাল এক ধরনের দানা ওঠে এবং দ্বিতীয়বারের মতো আবার জ্বর দেখা দেয়। তবে ডেঙ্গুর প্রকৃতি এবং পরিণতি সবক্ষেত্রে, সবার ক্ষেত্রে একরকম হয় না। কারও কারও ক্ষেত্রে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপের দিকে মোড় নিতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক মানুষ উচ্চ ঝুঁকিতে পড়ে যেতে পারেন। আবার বয়স্ক রোগীদের মধ্যে যারা হৃদরোগ, কিডনি, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, ব্রংকাইটিস ও স্ট্রোক ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত তাদের ঝুঁকি সর্বাধিক।

পরীক্ষা করবেন : জ্বরের প্রথম বা দ্বিতীয় দিনে CBC এবং Dengue NS1 Ag পরীক্ষা করলেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগ ধরা পড়ে। জ্বরের পঞ্চম দিন থেকে CBC, Dengue IgM Ab, SGPT পরীক্ষা করতে হবে।

কী করবেন : আতঙ্কিত হবেন না। আতঙ্ক আপনার কোনো উপকারে আসবে না। রোগের তীব্রতা অনুযায়ী চিকিৎসক আপনাকে উপদেশ দিবেন। রক্তের কাউন্ট স্বাভাবিক থাকলে বিশ্রাম নিবেন। জ্বরে মানুষের শরীর থেকে পানি উড়ে গিয়ে পানিশূন্য হয়ে যেতে পারে। তাতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যেমন লিভার, কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই প্রচুর তরল খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। জ্বর কমাতে শুধু প্যারাসিটামল দেওয়া যেতে পারে। খবরদার জ্বর বা শরীর ব্যথার জন্য ব্যথানাশক ওষুধ (যেমন clofenac, diclofen, ultrafen, voltalin, voltaren, ibuprofen, brufen, inflam, naproxen, indomet, etorix, coxib ও disprin ইত্যাদি) তা মুখে বা মলদ্বারে দেওয়া যাবে না।

ব্যথানাশক কেন নয় : ডেঙ্গুজ্বরে রক্তের জমাটবাঁধার প্রধান উপাদান অনুচক্রিকা কমে যেতে পারে। অনুচক্রিকা দেহের স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহে একটি নিখুঁত ভারসাম্য রক্ষা করে। ডেঙ্গুজ্বরে সেই ভারসাম্যটি ভেঙে পড়তে পারে। মনে রাখতে হবে, প্রায় সব ধরনের ব্যথানাশক ওষুধ অনুচক্রিকার বিরুদ্ধে কাজ করে। ফলে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’র মতো কমতে থাকা অনুচক্রিকা ব্যথানাশকের আক্রমণে দ্রুত অকার্যকর হয়ে রোগীকে রক্তক্ষরণের ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে।

হাসপাতালে কখন ভর্তি হবেন : ডেঙ্গু ধরা পড়ার পর থেকে প্রতিদিন রক্তের CBC পরীক্ষা করতে হবে। যদি দেখা যায় অনুচক্রিকা স্থিতিশীল রয়েছে, রোগী মুখে পর্যাপ্ত খেতে পারছেন তাহলে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। বাড়িতে বসেই চিকিৎসা নিতে পারবেন। যদি অনুচক্রিকা দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে এবং রোগীর রক্তচাপ কমতে থাকে, নাড়ির গতি বাড়তে থাকে, মুখে পর্যাপ্ত খেতে পারেন না তাহলে তাকে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। আর যদি দেখা যায় অনুচক্রিকা ধীরগতিতে কমছে তাহলে বাড়িতে বসে প্রতিদিন CBC করতে হবে। অনুচক্রিকা বাড়তে শুরু করলে আর ভয় নেই। ধীরে ধীরে রোগী ভালো হয়ে যাবেন। প্রয়োজনে এ সময় চিকিৎসকের যথাযথ পরামর্শ নিতে হবে।

হৃদরোগীরা কী করবেন : যারা হৃদরোগে আক্রান্ত তাদের অনির্দিষ্টকালের জন্য রক্ত পাতলা করার ওষুধ খেতে হয়। এই ওষুধগুলো রক্তের অনুচক্রিকার বিরুদ্ধে কাজ করে এদের কার্যক্ষমতাকে হ্রাস করে দেয়। এটি দরকার হয় রক্তনালির ভিতর অনাকাঙ্ক্ষিত রক্ত যাতে জমাট বাঁধতে না পারে। কিন্তু ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে কমতে থাকা অনুচক্রিকা যেখানে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় সেখানে এই জাতীয় পাতলা করার ওষুধ রক্তক্ষরণের সম্ভাবনাকে অনেকগুণ বৃদ্ধি করে। সুতরাং হৃদরোগীরা ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্তপাতলা করার সব ওষুধ সঙ্গে সঙ্গে সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে হবে। ডাক্তারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে তার নির্দেশমত চলতে হবে এবং যখনই অনুচক্রিকা স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসবে তখন ডাক্তার সবদিক বিবেচনা করে পুনরায় রক্ত পাতলা করার ওষুধ শুরু করার পরামর্শ দিবেন। এছাড়া প্রায়শই দেখা যায়, হৃদরোগীদের অনেকের হৃদরোগ ছাড়াও উচ্চরক্তচাপ, হার্ট ফেইলিউরের ওষুধ খেতে হয়। এসব ওষুধ রক্তচাপকে আরও কমিয়ে দিতে পারে। তাই এসব ওষুধ ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শক্রমে সাময়িক বন্ধ রাখতে হবে। ডেঙ্গু রোগে অনেক ক্ষেত্রে লিভার আক্রান্ত হয়। SGPT, bilirubin বেড়ে যেতে পারে। তাই যারা কোলেস্টেরল কমার ওষুধ খান তাদের সাময়িকভাবে এসব ওষুধ বন্ধ রাখতে হবে।

যাদের ডায়াবেটিস আছে ডেঙ্গুর কারণে তাদের রক্তের সুগার ওঠানামা করতে পারে। তাই ওষুধ/ইনসুলিন নেওয়ার আগে ঘন ঘন রক্তের সুগার পরীক্ষা করে ডোজ অ্যাডজাস্ট করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা এ সময় আমাদের নিজেদেরও সচেতনতা বাড়াতে হবে। রোধ করতে হবে এডিস মশার বংশবৃদ্ধি।

লেখক : সিনিয়র কার্ডিওলজিস্ট, ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হসপিটাল, ধানমন্ডি, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights