গ্রেফতারি পরোয়ানার পর জামিন পেলেন সিমিন রহমান
নিজস্ব প্রতিবেদক
ভুয়া স্বাক্ষর ও স্ট্যাম্প জালিয়াতি করে ট্রান্সকম গ্রুপের ১৪ হাজার ১৬০টি শেয়ার (প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা) আত্মসাতের অভিযোগে করা মামলায় আত্মসমর্পণ করে জামিন পেয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির সিইও সিমিন রহমান ও তার মা মিসেস শাহনাজ রহমান।
বুধবার দুপুর ২টায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির দুই ঘণ্টার মধ্য ঢাকা মহানগর হাকিম জুয়েল রানার আদালতে জামিন শুনানি হয়। আদালত শুনানি শেষে ৫০০ টাকা মুচলেকা বন্ডে তাদের জামিনের আবেদন মঞ্জুর করেন।
এদিন বিকেল সাড়ে ৩ টার দিকে সিমিন রহমান ও তার মা শাহনাজ আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। এ সময় তারা কালো বোরকা পড়ে ও মুখ ঢেকে আদালতে উপস্থিত হন। তাদের পক্ষে আইনজীবীরা আদালতে জামিন আবেদন করেন।
এর আগে, দুপুরে ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম মো. সেফাতুল্লাহের আদালত এই মামলায় ছয় আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট আমলে নেন। এ সময় আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় সিমিন রহমান ও তার মা শাহনাজসহ তিনজনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। গ্রেফতারি পরোয়ানা দেওয়া আরেকজন হলেন, ট্রান্সকম গ্রুপের পরিচালক সামসুজ্জামান পাটোয়ারী।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, আজ এই মামলায় অভিযুক্ত ছয় আসামির মধ্যে ট্রান্সকম গ্রুপের পরিচালক মো. কামরুল হাসান, মো. মোসাদ্দেক ও আবু ইউসুফ মো. সিদ্দিক আদালতে উপস্থিত ছিলেন। পরে তাদের আইনজীবী স্থায়ী জামিন চেয়ে আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। তবে সিমিন রহমানসহ তিন আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। আগামী ২ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী শুনানির তারিখ ধার্য রয়েছে।
২০২৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শাযরেহ হক বাদী হয়ে গুলশান থানায় মামলা করেন। তদন্ত শেষে গত ১১ জানুয়ারি পিবিআইয়ের পরিদর্শক সৈয়দ সাজেদুর রহমান আদালতে অভিযোগ পত্র দাখিল করেন। এতে সিমিন রহমানসহ ছয়জনকে অভিযুক্ত করা হয়।
মামলার চার্জশিটে বলা হয়, ২০২০ সালের ১৩ জুন ঢাকায় বোর্ড মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। সেই মিটিংয়ের অ্যাজেন্ডা হিসেবে ছিল পূর্বের মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত অনুমোদন; ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মিটিংয়ে অংশগ্রহণ ও ইলেকট্রনিক সিগনেচারের অনুমোদন; লতিফুর রহমান কর্তৃক শেয়ার হস্তান্তরের বিষয়ে অনুমোদন। এই মিটিংয়ে হাজিরা শিটে লতিফুর রহমানকে ছুটিতে দেখানো হয়েছে। হাজিরা শিটে আরশাদ ওয়ালিউর রহমানের স্বাক্ষর থাকলেও মিটিংয়ের সময় তিনি কুমিল্লায় অবস্থান করেন। এই বোর্ড মিটিংয়ে তৃতীয় অ্যাজেন্ডার মাধ্যমে লতিফুর রহমানের ২৩ হাজার ৬০০ শেয়ারের মধ্যে তার বড় মেয়ে সিমিন রহমানকে ১৪ হাজার ১৬০টি, ছেলে আরশাদ ওয়ালিউর রহমান ও ছোট মেয়ে শাযরেহ হককে চার হাজার ৭২০টি শেয়ারসহ সর্বমোট ২৩ হাজার ৬০০টি শেয়ার হস্তান্তর করা হয়েছে।
এই মিটিংয়ের বিষয়ে শাযরেহ হক দাবি করেন, এই ধরনের বোর্ড মিটিং ২০২০ সালের ১৩ জুন তারিখে অনুষ্ঠিত হয়নি। তদন্তকালে কোম্পানির বর্তমান পরিচালককে ওই তারিখের বোর্ড মিটিং ও রেগুলেশনের কাগজপত্র উপস্থাপনের জন্য বলা হলে আসামিপক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এছাড়া, তদন্তে বোর্ড মিটিংয়ের আগে কোনো ই-মেইল অথবা ডাকযোগে কোনো নোটিশ বা চিঠির কপি পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি আরজেএসসিতে (যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তর) জমাকৃত শেয়ার হস্তান্তরে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন সিমিন রহমান।
আরও বলা হয়েছে, ২০২০ সালের ১৩ জুন ট্রান্সকম লিমিটেডের শেয়ার হস্তান্তরের কাগজপত্র আরজেএসসিতে জমা দেওয়া হয়। ওই বছরের ১৭ আগস্ট শেয়ার হস্তান্তর হলেও আরজেএসসি নিয়ম অনুযায়ী শেয়ার হস্তান্তরের ফি পরিশোধ না করে বিলম্বে একই বছরের ২ সেপ্টেম্বর শেয়ার হস্তান্তরের ফি পরিশোধ করা হয়েছে। এই শেয়ার হস্তান্তর জমা প্রক্রিয়ায় অনিয়ম করা হয়েছে। শেয়ার হস্তান্তরের সময় দাতা ও গ্রহীতা কোনো পক্ষই আরজেএসসিতে উপস্থিত ছিলেন না। শেয়ার হস্তান্তর প্রক্রিয়া চলাকালে শেয়ার গ্রহীতা অর্থাৎ আসামিদের পক্ষে শুধু অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু নিয়ম হচ্ছে, শেয়ার হস্তান্তরের সময় দাতা ও গ্রহীতা উভয় পক্ষকে সশরীরে উপস্থিত থেকে আরজেএসসির প্রতিনিধির সম্মুখে উভয় পক্ষকে স্বাক্ষর করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু শেয়ার হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় এই নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি, যা ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনের ৩৮ ধারার লঙ্ঘন।
এছাড়া, ২০২০ সালে ভাই-বোনের ভুয়া স্বাক্ষর ব্যবহার করে বেশিরভাগ শেয়ার নিজের নামে নেওয়ার জন্য সিমিন গ্রুপ অব কোম্পানির নথিপত্র ও পারিবারিক ডিড অব সেটলমেন্ট তৈরি করেন। এ জন্য সিমিন রহমান দুটি ভুয়া স্ট্যাম্প অ্যাফিডেভিট ব্যবহার করে সেখানে ছোট বোন শাযরেহ হকসহ বাবা, ভাই ও অন্যদের স্ক্যান করা স্বাক্ষর ব্যবহার করে ট্রান্সকমের বেশিরভাগ শেয়ার ট্রান্সফারের দলিল তৈরি করেন এবং এগুলো আরজেএসসিতে দাখিল করেন সিমিন। শাযরেহ হকের নামে আরজেএসসিতে সিমিনের করা অ্যাফিডেভিটের নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ২০২৩ সালে সৃজনকৃত বলে সম্প্রতি ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে দেওয়া ডাক বিভাগ ও ঢাকা জেলা প্রশাসকের অফিসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
চার্জশিটে আরও বলা হয়, জাল সন্দেহ হওয়ায় দুটি স্ট্যাম্পের সত্যতা নিয়ে ঢাকার জেলা প্রশাসকের কাছে একটি প্রতিবেদন চান আদালত। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, যে ভেন্ডর থেকে এই স্ট্যাম্প দুটি সরবরাহের তথ্য রয়েছে, ওই ভেন্ডরের লাইসেন্স ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর বাতিল করা হয়। তিনি ২০২৩ সালের স্ট্যাম্পকে অসদুপায়ে সংগ্রহ করে আসামিপক্ষকে ২০২০ সালের ৩ মার্চ নিজ স্বাক্ষরে সরবরাহ করেন।
