​দিনাজপুরে সুগন্ধি ধানের বাজারে আগুন: ভরা মৌসুমেও চালের দাম আকাশছোঁয়া

আব্দুস সালাম, দিনাজপুর প্রতিনিধি :

​দেশের শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত উত্তরের জেলা দিনাজপুরে এবার সুগন্ধি ধানের ভরা মৌসুমেও চালের বাজারে রীতিমতো আগুন লেগেছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ফলন বিপর্যয় এবং বাজারে সরবরাহ সংকটের অজুহাতে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে সুগন্ধি চিনিগুড়া ধান ও চালের দাম। গত বছরের তুলনায় বস্তাপ্রতি ধানের দাম বেড়েছে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত, আর চালের কেজিতে বেড়েছে ৩০ থেকে ৪০ টাকা। ফলে সাধারণ ক্রেতাদের নাভিশ্বাস উঠলেও ফলন কম হওয়ায় কৃষকের ঘরে লাভের গুড় খুব একটা পৌঁছাচ্ছে না বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
​সরেজমিনে দিনাজপুরের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে মানভেদে সুগন্ধি চিনিগুড়া চাল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৩০ থেকে ১৫০ টাকায়। অথচ গত বছর এই সময়ে একই চাল ১০০ থেকে ১১০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। শুধু চালই নয়, শীতের মৌসুমে পিঠা-পুলির অপরিহার্য অনুষঙ্গ চিনিগুড়া চালের ‘খুদ’ বা কণা চালের দামও দ্বিগুণ হয়েছে। গত বছর যে খুদ ৩০-৩৫ টাকায় পাওয়া যেত, তা এখন বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি দরে।
​বাজারে আসা ক্রেতা নুরনাহার বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত বছর যে খুদ ৩০ টাকায় কিনেছি, এখন তা ৬০ টাকা। চালের দাম বাড়ায় পিঠা বানানোর স্বাদও যেন তেতো হয়ে যাচ্ছে। বাজারে কোনো তদারকি নেই।
​ধানের দাম বাড়লেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। সদর উপজেলার কৃষক শাহীন আলম জানান, গত বছর ৪৮ শতাংশের এক বিঘা জমিতে তিনি ২০ মণ ধান পেয়েছিলেন। কিন্তু এ বছর বৈরী আবহাওয়ায় ধানগাছ পড়ে যাওয়ায় একই জমিতে ফলন নেমে এসেছে ১২ থেকে ১৪ মণে। তিনি বলেন, ধানের দাম বেশি হলেও ফলন এত কম যে খরচ তুলেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। আমাদের লাভ আগের মতোই রয়ে গেছে, মাঝখানে ফড়িয়া আর ব্যবসায়ীরা লাভ করছে।
​ব্যবসায়ীরা ধানের উচ্চমূল্যকেই চালের দাম বাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন। ব্যবসায়ী আব্দুল হাকীম জানান, গত বছর ৭৬ কেজির এক বস্তা ব্রি-৩৪ (চিনিগুড়া) ধান ৪২০০-৪৩০০ টাকায় কেনা সম্ভব হলেও এবার তা কিনতে হচ্ছে ৫৭০০ থেকে ৫৮০০ টাকায়। চালকল মালিক আলতাফ হোসেনের দাবি, উৎপাদন কম হওয়ায় বাজারে ধানের সরবরাহ অত্যন্ত নগণ্য। বেশি দামে ধান কিনে চাল তৈরি করতে গিয়ে খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে।
​দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলায় প্রায় ১ লাখ হেক্টর জমিতে চিকন ও সুগন্ধি জাতের ধানের আবাদ হয়েছে। এর বিপরীতে চাল উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) আনিছুজ্জামান অবশ্য আশার কথা শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, ফলন কিছুটা কম হলেও কৃষকরা এবার ধানের ভালো দাম পাচ্ছেন। এছাড়া খড়ের দামও এবার চড়া, যা কৃষকের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে দিচ্ছে।
​তবে সাধারণ ভোক্তাদের দাবি, দেশের সুগন্ধি চালের চাহিদার বড় অংশ যোগান দেওয়া দিনাজপুরের বাজারে যদি এই অবস্থা হয়, তবে সারাদেশে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে। বাজার নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
2 Attachments
• Scanned by Gmail

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights