কুয়াকাটায় এতিম শিশুদের নিয়ে বসুন্ধরা শুভসংঘের ব্যতিক্রমী আয়োজন

অনলাইন ডেস্ক

কুয়াকাটার বিকেলটা সেদিন ছিল অন্যরকম। সমুদ্রের লোনা বাতাসে মিশে ছিল এক অদ্ভুত কোমল অনুভূতি। চারপাশের আলো–হাওয়া যেন বলে দিচ্ছিল সেই কোমলতার নাম-ভালোবাসা। এমনই এক ভালোবাসার উষ্ণতায় ভরা বিকেল নেমে এসেছিল পটুয়াখালীর পর্যটন নগরী কুয়াকাটায়, যেখানে ভালোবাসা দিবসকে কেন্দ্র করে এক ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজন ছুঁয়ে গেল এতিম শিশুদের হৃদয়।

রবিবার বিকেলে কুয়াকাটার আলীপুর রশিদিয়া এতিমখানার পরিবেশ যেন অন্যদিনের চেয়ে আলাদা হয়ে উঠেছিল। সেখানে ছিল না কেবল নিয়মিত পাঠ আর নীরব সময় কাটানোর রুটিন-ছিল হাসি, আনন্দ, খেলাধুলা আর ভালোবাসায় ভরা কিছু মানুষের আন্তরিক উপস্থিতি। বসুন্ধরা শুভসংঘ কুয়াকাটা পৌর শাখার সদস্যরা হাজির হয়েছিলেন শিশুদের মাঝে ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে।

এদিন ছিল এতিম শিশু তালহার জন্মদিন। তালহার জন্য জন্মদিন মানেই হয়তো সাধারণত আর দশটা দিনের মতোই একটি দিন। কিন্তু এদিনটা ছিল ভিন্ন। কেক কাটা, চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধুরা, শুভেচ্ছার সুর-সব মিলিয়ে তার মুখে ফুটে ওঠে অবাক করা এক নির্মল হাসি। বসুন্ধরা শুভসংঘের সদস্যরা তালহার হাত ধরে কেক কাটেন, আর সেই মুহূর্ত যেন ভালোবাসার এক নীরব বার্তা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে উপস্থিত সবার হৃদয়ে।

শুধু তালহাই নয়, ইয়াতিমখানার অন্য শিশুরাও সেই আনন্দের সমান অংশীদার হয়ে ওঠে। জন্মদিনের কেকের মিষ্টতা ছড়িয়ে পড়ে আরও দূরে, যখন উপস্থিত শিশুদের মাঝে বিতরণ করা হয় চকলেট। ছোট ছোট হাতগুলো যখন চকলেট নেয়, তাদের চোখে ফুটে ওঠা আনন্দ কোনো ভাষায় প্রকাশ করার নয়।

এরপর আয়োজন করা হয় খেলাধুলার। হাসি, দৌড়ঝাঁপ আর উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠে এতিমখানার প্রাঙ্গণ। বিকেলের আলোয় সেই দৃশ্য যেন এক টুকরো মানবিক পৃথিবীর ছবি-যেখানে ভেদাভেদ নেই, আছে শুধু মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গল্প।

অনুষ্ঠানে প্রায় ২৫ জন এতিম শিশু এবং নূরানী শাখার প্রায় ১০০ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল। এত শিশুদের একসঙ্গে এমন আনন্দে মেতে উঠতে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ইয়াতিমখানার প্রধান তত্ত্বাবধায়ক হাফেজ মো. সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, বসুন্ধরা শুভসংঘ কুয়াকাটা পৌর শাখার এমন উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। এ ধরনের আয়োজন এতিম শিশুদের মাঝে আনন্দ ও অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে, একই সঙ্গে সমাজে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শিশুরাও আয়োজকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। তাদের অনেকের কাছেই হয়তো জন্মদিন মানে কেবল গল্পে শোনা এক উৎসব। কিন্তু এদিন তারা দেখেছে—ভালোবাসা সত্যিই ভাগ করে নেওয়া যায়, আর কেউ কেউ আছে যারা তাদের আনন্দের কথা ভাবে।

বসুন্ধরা শুভসংঘ কুয়াকাটা পৌর শাখার সভাপতি মো. সাইদুর রহমান জানান, সমাজের অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়ানোই তাদের মূল লক্ষ্য। ভবিষ্যতেও এমন মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. জাহিদুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম, সহ-সভাপতি রাসেল, অর্থ সম্পাদক আল-আমীন, সদস্য জাবের ও সোলাইমান, কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান, নূরানী শাখার শিক্ষক মাওলানা বেলাল হোসাইন ও মাওলানা নাজমুল হাসানসহ অনেকে।

ভালোবাসা দিবস মানেই শুধু ফুল, কার্ড আর আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা নয়-এ কথা নতুন করে মনে করিয়ে দিল কুয়াকাটার এই আয়োজন। ভালোবাসা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা ছুঁয়ে যায় এমন কিছু হৃদয়, যারা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসার অপেক্ষায় থাকে।

এতিম শিশু তালহার জন্মদিন ঘিরে যে আনন্দের ঢেউ উঠেছিল, তা আসলে ছিল মানবিকতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ-যেখানে ভালোবাসা কোনো সম্পর্কের সীমায় আবদ্ধ নয়, বরং তা ছড়িয়ে পড়ে সমাজের প্রতিটি কোণে, প্রতিটি অসহায় মুখে হাসি হয়ে। ভালোবাসা একটি নির্দিষ্ট দিনে নয়, সহমর্মিতা আর ভালোবাসা হোক নিত্যদিনের।

এই আয়োজন যেন আমাদের সবাইকে নতুন করে ভাবতে শেখায়-ভালোবাসা প্রকাশের সবচেয়ে সুন্দর উপায় হলো, কারও জীবনে একটুখানি আনন্দের কারণ হয়ে ওঠা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights