দিনাজপুরে লিচুর মুকুলে হাসছে চাষির স্বপ্ন

আব্দুস সালাম, দিনাজপুর প্রতিনিধি
বসন্তের ফুরফুরে বাতাসে এখন দিনাজপুরের লিচু বাগানগুলোতে মৌ-মৌ গন্ধ। যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই সোনালী মুকুলের সমারোহ। আর এই মুকুলের ভিড়েই লুকিয়ে আছে হাজারো চাষির সারা বছরের স্বপ্ন। গত বছরের জিআই স্বীকৃতি পাওয়া বেদানা লিচু থেকে শুরু করে চায়না-থ্রি কিংবা মাদ্রাজি সব জাতের গাছেই এবার মুকুলের জোয়ার এসেছে। কৃষকের ভাষায়, এ যেন এক সাদা মেঘের বাগান, যা আগামীর সুদিনের জানান দিচ্ছে।
দিনাজপুরের সদর, বিরল ও চিরিরবন্দরসহ বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে উৎসবমুখর পরিবেশ। চাষিরা এখন নাওয়া-খাওয়া ভুলে ব্যস্ত বাগানের পরিচর্যায়। কেউ গাছে পানি দিচ্ছেন, কেউবা মুকুলকে পোকার হাত থেকে বাঁচাতে বিশেষজ্ঞের পরামর্শে স্প্রে করছেন।
বিরলের লিচু চাষি আব্দুল কাদিরের চোখেমুখে এখন খুশির ঝিলিক। তিনি জানান, মুকুল আসা মানেই আমাদের ঘরে নতুন আশার আলো। এবার আবহাওয়া এখন পর্যন্ত আমাদের সহায় আছে। যদি বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হয়, তবে গতবারের রেকর্ডও ছাড়িয়ে যাবে ফলন।
দিনাজপুরের লিচু কেবল স্থানীয় অর্থনীতি নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতিতেও বড় ভূমিকা রাখছে। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, গত বছর প্রায় ৫ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমিতে ২৫ হাজার মেট্রিক টনের বেশি লিচু উৎপাদিত হয়েছিল। এবার সেই লক্ষ্যমাত্রা আরও ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।
এই তিন-চার মাস লিচু বাগানগুলোকে ঘিরে তৈরি হয় বিশাল কর্মযজ্ঞ। একদিকে যেমন বাগান মালিকরা লাভের স্বপ্ন দেখেন, অন্যদিকে হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী থেকে পাইকাররা এখনই আসতে শুরু করেছেন। অনেক বাগান তো মুকুল অবস্থাতেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে লাখ লাখ টাকায়।
গত বছর দিনাজপুরের বিখ্যাত বেদানা লিচু জিওগ্রাফিকাল ইন্ডিকেশন (জিআই) স্বীকৃতি পাওয়ায় এর কদর বেড়েছে বহুগুণ। স্থানীয়দের কাছে এটি প্রকৃতির রসগোল্লা হিসেবে পরিচিত। এই গৌরবের কারণে এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে দিনাজপুরের লিচু বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। কৃষিবিদদের মতে, সঠিক মান নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে এটি বিদেশের বাজারে বাংলাদেশের একটি বড় ব্র্যান্ড হয়ে উঠবে।
কৃষকদের এই কর্মযজ্ঞে ছায়ার মতো পাশে আছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. আফজাল হোসেনের নির্দেশনায় মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সরাসরি বাগানে গিয়ে চাষিদের পরামর্শ দিচ্ছেন। কোন সময় সেচ দিতে হবে কিংবা কোন কীটনাশক ব্যবহার করলে মুকুলের ক্ষতি হবে না, তা নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কাজ চলছে।
দিনাজপুরের লিচু বাগানগুলো কেবল ব্যবসার জায়গা নয়, বরং এটি এখানকার মানুষের আবেগের নাম। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে চাষিরা যখন একটি গাছকে বড় করে তোলেন, তখন প্রতিটি লিচু তাদের কাছে সন্তানের মতো মূল্যবান হয়ে ওঠে। মুকুলের এই হাসি যেন শেষ পর্যন্ত কৃষকের গোলায় সোনার ফসলের হাসি হয়েই থাকে এমনটাই প্রত্যাশা সবার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights