অভিবাসী কর্মীদের নিয়োগপ্রক্রিয়ায়ই মূল গলদ
গত ২৩ জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সংঘটিত দুর্নীতি নিয়ে ব্লুমবার্গ একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে কর্মী নিয়োগ ব্যবস্থায় দুঃসহ দুর্নীতির উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, এই প্রক্রিয়া রাজনীতিতে যুক্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ধনী বানাচ্ছে, আর কর্মীদের ঋণ, শোষণ ও বাধ্য-শ্রমের চক্রে আবদ্ধ করছে। মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণের ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশিদের অনেক বেশি অর্থ প্রদান করতে হয়।
প্রতিবেদনটির মতে, মালয়েশিয়ার শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে থাকা ব্যক্তিরা কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়ার অপব্যবহার সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও সেসবের সমাধান করেননি। কারণ উচ্চ অভিবাসন ব্যয়ের বড় অংশই দুই পক্ষের পকেটে যায়। মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ, যিনি নিয়োগপদ্ধতি সংস্কারের পক্ষে ছিলেন, তিনিও বলেছেন যে এতে অনেক স্তরের মানুষ জড়িত। ব্লুমবার্গ দুই দেশের সরকারের বক্তব্য নিতে গিয়ে তাদের কাছ থেকে কোনো সাড়া পায়নি।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালয়েশিয়ান এবং বেস্টিনেটের প্রতিষ্ঠাতা আমিনুল ইসলামকে এই ব্যবস্থার প্রবর্তক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ২০১৫ সালে মালয়েশিয়া বেস্টিনেটের ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যখন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেদ জাহিদ হামিদি ১৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। মাত্র ১০টি বাংলাদেশি এজেন্সিকে কর্মী নিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়। অবশ্য জাহিদ হামিদি জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন এবং আমিন বলেছেন, মালয়েশিয়া সরকারই এজেন্সিগুলোকে বেছে নিয়েছিল।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে বর্তমান ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, বিশ্লেষক, রিক্রুটিং এজেন্ট এবং বাংলাদেশি অভিবাসীসহ ১০০ জনেরও বেশি ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। তাঁদের মতে, নিয়োগপ্রক্রিয়াটিকে দুর্নীতির বিস্তার এবং বিদেশে যেতে আগ্রহী কর্মীদের কাছ থেকে প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে বেশি অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যেই ডিজাইন করা হয়েছিল।
ব্লুমবার্গের এই প্রতিবেদনে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে চার্লস সান্তিয়াগো নামের একজন বিশ্লেষক বলেছেন, যখন সংগঠিতভাবে শোষণ করা হয়, যখন নিয়োগ করে কর্মে জবরদস্তি করা হয় এবং যখন দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আর্থিক লাভ করা হয়, তখন বিষয়টি আর নীতির মধ্যে থাকে না; এটি অপরাধে পরিণত হয়। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীরা যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, তা পাচার, জোরপূর্বক শ্রম এবং কাঠামোগত শোষণের পর্যায়ে পড়ে। এটি কাগজপত্রের ব্যর্থতা নয়, এটি ন্যায়বিচারের ব্যর্থতা।
অন্যান্য সুপারিশের সঙ্গে তিনি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রিত নিয়োগপ্রক্রিয়া নিষিদ্ধ করে প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসহ স্বচ্ছ ও রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত নিয়োগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার সুপারিশ করেছেন, যে ক্ষেত্রে কর্মী প্রদত্ত নিয়োগ ফি নিয়োগকর্তা বহন করবেন।
প্রতিবেদনটির বক্তব্য এবং চার্লস সান্তিয়াগোর প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে একমত পোষণ করে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। ২০০৯ সালের ১০ মার্চ মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে জারীকৃত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ২৬ নভেম্বর দুই দেশের মধ্যে জি টু জি পদ্ধতিতে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। পদ্ধতিটিতে কোনো রিক্রুটিং এজেন্সি জড়িত না থাকায় এবং অনলাইনে নিয়োগ করার কারণে সর্বোচ্চ ৩৫ হাজার টাকা অভিবাসন ব্যয়ের মধ্যে একজন কর্মী মালয়েশিয়ায় যেতে পারতেন। ওই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে নানা বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে কর্মীদের প্রথম দলটি ২০১৩ সালের ২৫ এপ্রিল কুয়ালালামপুরে পৌঁছে। এটি ছিল সম্পূর্ণভাবে কর্মীবান্ধব এবং ন্যূনতম ব্যয়ের নিরাপদ নিয়োগ ব্যবস্থা, যা একই সঙ্গে শোষণ বা মানবপাচার থেকে সুরক্ষিত ছিল। ওই নিয়োগপ্রক্রিয়া বাস্তবায়নে মালয়েশিয়ার তদানীন্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিশামুদ্দিন ও মানবসম্পদ মন্ত্রী সুব্রামনিয়ামের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
মালয়েশিয়ায় ২০১৩ সালের মে মাসে সাধারণ নির্বাচনের পর ২৭ মে নতুন মন্ত্রিসভার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেদ জাহিদ হামিদির সঙ্গে পুত্রজায়ায় তাঁর অফিসে এক সৌজন্য সাক্ষাৎকালে আমি রাষ্ট্রদূত হিসেবে তাঁকে কর্মী নিয়োগের ওই ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানালে তিনি আমাকে নিশ্চয়তা দেন। কিন্তু পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি ওই ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য লেগে পড়েন। জাহিদ হামিদি ২০১৪ সালের ৩১ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ সফর করেন। সে সময় তিনি আমাদের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রীর কাছে একটি চিঠি লিখে চলমান জি টু জি ব্যবস্থা এড়িয়ে মালয়েশিয়ার ফেলডা কম্পানির জন্য দুই হাজার কর্মী নিয়োগের অনুরোধ জানান, যা বাংলাদেশ অনুমোদন করেনি। সফরকালে তিনি আমাদের পরিকল্পনামন্ত্রীর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন, যাঁর নিজেরও রিক্রুটিং এজেন্সি ছিল। মূলত ওই সফরের উদ্দেশ্য ছিল নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বেসরকারি খাতের লোকদের সম্পৃক্ত করা।
২০১৪ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে আমি মালয়েশিয়ায় দায়িত্ব ত্যাগ করে দেশে ফেরার কয়েক মাসের মধ্যেই যারা জি টু জি পদ্ধতির বিরোধিতা করেছিল, তারা বের হয়ে আসে। দুই পক্ষের আশীর্বাদে ওই গোষ্ঠী তাদের প্রচেষ্টায় সফল হলে ২০১৬ সালে দুই দেশের মধ্যে ‘জি টু জি প্লাস’ নামের একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এতে এক হাজারের অধিক নিবন্ধিত বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সিকে বাদ দিয়ে মাত্র ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সির একটি সিন্ডিকেটকে কর্মী প্রেরণের সুযোগ দেওয়া হয়। মালয়েশিয়ায় সরকার পরিবর্তন হলে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর দুই দেশের মধ্যে নতুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর মালয়েশিয়া থেকে ফিরে এসে আমাদের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ২১ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন যে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ডেটা বেইস থেকে কর্মীদের পাঠানো হবে এবং অভিবাসনের খরচ একজন শ্রমিকের দু-তিন মাসের বেতনের বেশি হবে না। কিন্তু বাস্তবে সেটি আর দেখা যায়নি। তবে আগের ১০টি এজেন্সির পরিবর্তে ১০০টি এজেন্সির সিন্ডিকেটে পরিণত হয়। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের এপ্রিলে ওই পদ্ধতিটিও বন্ধ হয়ে যায়।
গত বছর ২ ও ৬ মে কালের কণ্ঠে প্রকাশিত ‘শ্রমিকের টাকায় স্বপন-আমিনের বিলাসী জীবন’ এবং ‘মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানিতে জালিয়াতি : শ্রমিকের ৮০০ কোটি টাকা স্বপনের পেটে’ শিরোনামের প্রতিবেদন দুটিতে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী প্রেরণে সিন্ডিকেটের শোষণ এবং সে দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের জীবনযাত্রার করুণ চিত্রের বর্ণনা পাওয়া যায়। ওই সিন্ডিকেট চক্রের অন্যতম কুশীলব হিসেবে রুহুল ইসলাম স্বপন ও আমিনুল ইসলামের (দাতো আমিন) শ্রমিক শোষণের কর্মকাণ্ড বর্ণনা করা হয়েছে। আর এই আমিনই বেস্টিনেটের ব্যানারে জি টু জি প্লাস নামের ১০ এজেন্সির সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কর্মীদের শোষণযন্ত্রের উদ্ভাবক। বলার অপেক্ষা রাখে না যে তাঁদের প্রশ্রয় দিয়েছেন উভয় দেশের ক্ষমতাধর রাজনৈতিক এবং সরকারি ব্যক্তিবর্গ।
এ বছরের জানুয়ারি মাসে আবুধাবি ডায়ালগ ২০২৬-এর অষ্টম মন্ত্রী পর্যায়ের সভায় অংশগ্রহণকালে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অভিবাসনের ক্ষেত্রে নৈতিক নিয়োগ, মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান এবং অভিবাসী শ্রমিকদের মানবিক মর্যাদা রক্ষায় অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর যৌথ প্রতিশ্রুতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, অভিবাসী শ্রমিকদের শোষণ ও অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো প্রেরণকারী ও গ্রহণকারী দেশগুলোর যৌথ উদ্যোগেই সমাধান সম্ভব।
আমাদের অভিবাসী কর্মীদের স্বার্থ চিরকালই অবহেলিত হয়ে আসছে। নিয়োগের শুরু থেকেই নানা প্রলোভন এবং রঙিন স্বপ্নের বেড়াজালে আবদ্ধ করে তাঁদের আর্থিকভাবে শোষণ করা হয়। কারণ নিয়োগপ্রক্রিয়াই যে দুর্নীতির উৎস। তাই আমাদের এই কর্মীদের ও কর্মীবান্ধব রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর স্বার্থ সংরক্ষণ করে একটি স্থায়ী অভিবাসীবান্ধব নিয়োগপ্রক্রিয়া প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ইতিবাচক উন্নতি ঘটাতে হলে মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ সরকারকে একটি গ্রহণযোগ্য সর্বসম্মত সমাধানে পৌঁছতে হবে। দুই দেশের সরকার যদি কর্মীদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যাপারে আন্তরিক ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়, তাহলে একটি কর্মীবান্ধব নিয়োগপ্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে সম্পৃক্ত করে ২০১২ সালের জি টু জি পদ্ধতির অনুসরণে ন্যূনতম অভিবাসন ব্যয়ের পদ্ধতি চালু করতে হবে। ওই পদ্ধতিতে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো তাদের প্রাপ্য থেকে যেমন বঞ্চিত হবে না, তেমনি আমাদের কর্মীদেরও শোষণের হাত থেকে বাঁচানো যাবে। আর সেটিই হতে পারে এ ক্ষেত্রে একটি স্থায়ী প্রক্রিয়া, যা দুই দেশের বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক আস্থাকে সুদৃঢ়ই করবে না, দুই দেশের এবং তাদের জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিকেও শক্তিশালী করবে।
লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব
