ইরানকে জ্ঞান-বিজ্ঞান শূন্য করার মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র?

ইরানের উচ্চশিক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যে দেশটির শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একের পর এক হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী। গত কয়েক সপ্তাহে ইরানের অন্তত ৩০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গবেষণা কেন্দ্র এই বিধ্বংসী আক্রমণের শিকার হয়েছে বলে দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

বিশেষ করে গত ৬ এপ্রিল ইরানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকৌশল বিদ্যাপীঠ শরীফ ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজিতে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটে। এই হামলায় কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া না গেলেও বিশ্ববিদ্যালয়টির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গবেষণা কেন্দ্রের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

পশ্চিম এশিয়ার এমআইটি হিসেবে পরিচিত শরীফ ইউনিভার্সিটির এই এআই কেন্দ্রটি গত দুই বছর ধরে ফার্সি ভাষার মডেল তৈরির কাজ করছিল। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত সহায়তা থেকে বঞ্চিত থাকলেও নিজেদের মেধা দিয়েই তারা এই ডাটাবেজ তৈরি করেছিল।

সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, এই কেন্দ্রটির সাথে কোনো সামরিক সংশ্লিষ্টতা ছিল না, বরং এটি সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য তথ্যপ্রযুক্তি সেবা প্রদান করত। এই হামলার মূল উদ্দেশ্য ইরানকে বিজ্ঞানের দৌড়ে কয়েক দশক পিছিয়ে দেওয়া বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়টির ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়েও ইরানি অধ্যাপক ও শিক্ষার্থীরা দমে যেতে রাজি নন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, একজন গণিত অধ্যাপক তার বোমায় বিধ্বস্ত শ্রেণিকক্ষেই ল্যাপটপ নিয়ে বসে অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছেন। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরিফ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন। তিনি এক্স হ্যান্ডেলে এক পোস্টে বলেন, ইরানের জ্ঞান পাথরের দেয়ালে বন্দি নয় যে বোমা মেরে তা ধ্বংস করা যাবে, বরং এর আসল শক্তি হলো তাদের অধ্যাপক ও মেধাবীদের দৃঢ় মনোবল।

হামলার এই ধারা কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং সুপরিকল্পিতভাবে সবকটি কারিগরি প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। গত ২৮ মার্চ ইরানের ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে হামলা চালানো হয় এবং এর একদিন পরই ইসফাহান ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি দ্বিতীয়বারের মতো আক্রান্ত হয়। ইসফাহানে হওয়া এই হামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন কর্মী আহত হয়েছেন এবং অনেক অবকাঠামো ধসে পড়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ইরানের রাডার এবং সাবমেরিন প্রযুক্তির গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত যা এখন বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও জীবন রক্ষাকারী গবেষণা কেন্দ্রগুলোকেও এই যুদ্ধের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। গত ২ এপ্রিল শতবর্ষী পাস্তুর ইনস্টিটিউট অফ ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয় যার ফলে দেশটির প্রধান ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী গবেষণাগারটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এছাড়া তেহরানের গান্ধী হাসপাতালের একটি আইভিএফ ক্লিনিক এবং শহীদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়ের লেজার গবেষণা কেন্দ্রও এই হামলার শিকার হয়েছে। এসব হামলায় কেবল স্থাপনা নয়, বরং মেধাবী গবেষকদেরও টার্গেট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ব্রিটিশ সোসাইটি ফর মিডল ইস্টার্ন স্টাডিজের মতে ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এই পরিস্থিতি গাজার শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের করুণ স্মৃতিকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সংরক্ষিত স্থাপনা হিসেবে বিবেচিত হলেও এই যুদ্ধে সেই আইনের কোনো তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে এটি কেবল সামরিক আক্রমণ নয় বরং একটি জাতির চিন্তা করার ক্ষমতা এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত। বছরের পর বছর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পর এখন সরাসরি বোমা মেরে ইরানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে।

ইরানের ভেতরে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটেও এই হামলার একটি ভিন্ন মাত্রা দেখছেন অনেক সমাজবিজ্ঞানী। ঐতিহাসিকভাবে ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সবসময়ই বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করেছে। বর্তমানে যুদ্ধ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দেওয়া বা অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্তটি শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সংহতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন বিদেশি শক্তির বোমা ইরানের অবকাঠামো ধ্বংস করছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা শিক্ষার পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছে।

দীর্ঘমেয়াদী এই যুদ্ধের প্রভাব ইরানের আগামী প্রজন্মের ওপর অত্যন্ত গভীর হতে চলেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গবেষণাগার ও গ্রন্থাগারগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পিএইচডি ও পোস্ট-ডক্টরাল পর্যায়ের অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ধীরগতির ইন্টারনেট এবং নিরাপত্তার অভাবে দেশজুড়ে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে এই ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ কেবল বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষতি করছে না, বরং একটি দেশের সার্বভৌম ও স্বাধীনভাবে জ্ঞান চর্চার সক্ষমতাকে চিরতরে নস্যাৎ করে দেওয়ার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ।

সূত্র: মিডলইস্ট আই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights