‘আমার বাজান নতুন জামা পরে হাসতে হাসতে বোনের বাড়ি গেছিল, কে জানত এটাই শেষ যাওয়া’

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি

‘আমার বাজান নতুন জামা-প্যান্ট কিনছিল। সেই জামা পরে হাসতে হাসতে বোনের বাড়ি গাজীপুর গেছিল। কে জানত, ওই যাওয়াই শেষ যাওয়া! আমার রসুল আমার ছোট ছেলে, আমার বুকের ধন। তোরা আমার রসুলরে আইনা দে…’

বুক চাপড়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই কথা বলতে বলতে বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিলেন ফেরেজা বেগম। একদিকে ছেলে, অন্যদিকে মেয়ে ও তিন নাতনিকে হারানোর শোকে যেন পাথর হয়ে গেছে তাঁর জীবন। স্বজনরা তাঁকে সামলানোর চেষ্টা করলেও মুহূর্তেই আবার ভেঙে পড়ছিলেন এই মা।

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার একটি ভাড়া বাসায় গলা কেটে হত্যার শিকার হওয়া একই পরিবারের পাঁচ সদস্যকে রবিবার (১০ মে) গোপালগঞ্জে দাফন করা হয়েছে।

এদিন বেলা ১১টায় গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পাইককান্দি ইউনিয়নের পাইককান্দি পঞ্চপল্লী মাদরাসা মাঠে জানাজার নামাজ শেষে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়। একই স্থানে পাশাপাশি পাঁচটি কবর খোঁড়া হয়। সেখানে নিহত শারমিন আক্তার, তাঁর ভাই ও তিন মেয়েকে দাফন করা হয়।

রবিবার সকাল ৬টার দিকে দুটি লাশবাহী গাড়িতে করে নিহতদের মরদেহ গ্রামের বাড়ি উত্তর চরপাড়া গ্রামে পৌঁছায়। মরদেহ পৌঁছানোর পর স্বজনদের আহাজারিতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।

নিহতরা হলেন— শারমিন আক্তার (৩০), তাঁর ভাই রসুল মোল্লা (১৮) এবং শারমিনের তিন মেয়ে মিম আক্তার (১৪), উম্মে হাবিবা (১০) ও ফারিয়া (১ বছর ৪ মাস)।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির আঙিনাজুড়ে শোকাহত মানুষের ভিড়। সন্তান ও নাতনিদের হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন শারমিনের মা ফেরেজা বেগম (৬০)। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে-মেয়ে, নাতনিদের মাইরা ফ্যালাইছে। আমার কলিজার টুকরাগো শেষ কইরা দিল। আমি এখন কী নিয়ে বাঁচমু রে আল্লাহ…’।

নিহত শারমিনের বাবা শাহাদত মোল্লা অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার ছেলে, মেয়ে ও নাতনিদের ফোরকান হত্যা করেছে। ফোরকানসহ যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদের দ্রুত গ্রেফতার ও ফাঁসির দাবি জানাই।’

উল্লেখ্য, শনিবার (৯ মে) সকালে কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোন গ্রামের একটি আবাসিক কলোনি থেকে রক্তমাখা অবস্থায় পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। গত শুক্রবার (৮) মে গভীর রাতের কোনো এক সময় ওই পাঁচজনকে গলা কেটে নির্মমভাবে হত্যার পর অভিযুক্ত স্বামী ফুরকান পালিয়ে যান। পরে শনিবার ভোরে পলাতক স্বামী নিহতের স্বজনদের কাছে মোবাইল ফোনে খুনের কথা জানান। এ ঘটনায় শনিবার (৯ মে) রাতে নিহত শারমিন বেগমের বাবা সাহাদত মোল্লা কাপাসিয়া থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় পলাতক ঘাতক ফুরকানসহ অজ্ঞাত চার-পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights