বসুন্ধরা কিংসই সেরা

মনোয়ার হক
কত বাধা, কত বিপত্তি। সবকিছু পেছনে ফেলে বিজয়ের হাসি হাসল বসুন্ধরা কিংস। আরেকটি ইতিহাস গড়েই ঘরোয়া ফুটবলে সবচেয়ে মর্যাদাকর আসর পেশাদার ফুটবল লিগে কিংস বসল কিংয়ের আসনে। ইতিহাস বা রেকর্ড গড়াটা তাদের যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। গতকাল কুমিল্লা শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে ২-০ গোলে ঢাকা আবাহনীকে হারিয়ে এক ম্যাচ আগেই শিরোপা নিশ্চিত করে কিংস। এ জয়ে তপু ও ডরিয়েলটনদের ১৭ ম্যাচে পয়েন্ট দাঁড়াল ৩৮। এখন ২৩ মে কিংস অ্যারিনায় যদি লিগের শেষ ম্যাচে ইয়ংমেন্স ফকিরেরপুলের কাছে হেরেও যায় শিরোপা অটুট থাকবে তাদের।

কুমিল্লায় ম্যাচটি ছিল অলিখিত ফাইনাল। যারা জিতবে তাদের শিরোপা নিশ্চিত করাটা ছিল শুধুই আনুষ্ঠানিকতা। ১৬ ম্যাচে কিংস ৩৫ আর আবাহনী ৩৪ পয়েন্ট নিয়ে নিজেদের ১৭তম ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল। আবাহনী জিতলে কিংসকে পেছনে ফেলে দুই পয়েন্টে এগিয়ে যেত। তখন আরামবাগকে হারাতে পারলে তারাই চ্যাম্পিয়ন হতো। কিংসের ফুটবলাররা প্রিয় দলকে বিপদে পড়তে দেননি। লিগের শুরু থেকে শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখে এক মৌসুম পরই লিগ শিরোপা ফিরে পেল বসুন্ধরা কিংস।

ইতিহাস২০০৭ সালে শুরু হওয়ার পর পেশাদার লিগে সবচেয়ে সফল দল ছিল ঢাকা আবাহনী। একবার হ্যাটট্রিকসহ সর্বোচ্চ ছয়বার শিরোপা জেতার রেকর্ড ছিল তাদেরই। এখন সেই রেকর্ডের ভাগিদার বসুন্ধরা কিংস। দুই দলই এখন ছয়বার করে লিগ জেতার কৃতিত্ব পেল। কিংসের আগমনের পর পেশাদার ফুটবলে আবাহনী আর লিগই জিততে পারেনি। শেষবার তারা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ২০১৭-১৮ মৌসুমে। অন্যদিকে অভিষেকের পর বিরতি ছাড়া টানা পাঁচবার লিগ জিতে ঘরোয়া ফুটবলে ইতিহাস গড়ে কিংস। গত মৌসুমে দুই ট্রফি জিতলেও লিগ হাতছাড়া করে তারা। চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ঢাকা মোহামেডান।

১৯৪৮ সালে ফুটবল লিগ শুরু হওয়ার পর প্রথম আট মৌসুমে কোনো দলই ছয়বার চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি। এ ইতিহাস শুধু কিংসেরই। আবাহনীর বিপক্ষে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে কিংস কিছুটা চাপ নিয়ে মাঠে নেমেছিল। কেননা আগের ম্যাচে কার্ড দেখায় কিংসের রাকিব টানা তিন ম্যাচে হলুদ কার্ড পান। তাই গতকাল আবাহনীর বিপক্ষে খেলেননি। অথচ তিনিই ছিলেন কিংসের আক্রমণ গড়ার মূল উৎস। ব্রাজিলিয়ান ডরিয়েলটন, ফাহিমের সঙ্গে জুটি বেঁধে রাকিব প্রতিপক্ষের দুর্গ ভেঙেছেন। ডরিয়েলটনের প্রায় প্রতি ম্যাচে গোল করার পেছনে বড় কারিগর ছিলেন রাকিবই। তিনি না থাকায় কিংস সমর্থকরা চিন্তিত ছিলেন আক্রমণ তৈরি করবেন কে? তার শেষ হলুদ কার্ড পাওয়া নিয়ে নানা কথাও উঠেছে ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে। কিন্তু নাম যাদের কিংস তারা কিং না হয়ে পারে? ঠিকই টিম স্পিরিট কাজে লাগিয়ে বছরের সেরা জয়টা তুলে নিয়েছে।

শিরোপার আশা জিইয়ে রাখতে আবাহনীর জয় ছাড়া বিকল্প কোনো পথ ছিল না। কিংসের মূল ভরসা যেমন ডরিয়েলটন, আবাহনীর সুলেমান দিয়াবাতে। আসল কাজের দিনেই সুলেমান ছিলেন বেশ ম্লান। অথচ আলোচনায় না ভালো খেলেছেন এমেকা। বদলি হিসেবে ব্রাজিলিয়ান ব্রুনোকে মাঠে নামিয়ে আবাহনী যখন এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছিল, তখনই কেঁপে ওঠে কিংসের সমর্থকরা। ৭১ মিনিটে ফাহিমকে ডি-বক্সের ভিতর আবাহনীর বাবলু ফাউল করলে কিংস পেনাল্টি পায়। ডরিয়েলটন ঠান্ডা মাথায় বল জালে পাঠানোর পর স্পষ্ট হয়ে যায় ম্যাচের ভবিষ্যৎ কি হতে যাচ্ছে? কিংসের যেমন শিরোপা নিশ্চিত হয়েছে, তেমনি ডরিয়েলটন সর্বোচ্চ গোলদাতা হতে যাচ্ছেন তা নিশ্চিত। তার গোল ১৭। সুলেমান দিয়াবাতের ১০। বাকি এক ম্যাচে সুলেমান কি ৭ গোল করতে পারবেন?

প্রথম লেগে কিংস অ্যারিনায় ২ গোলে এগিয়ে থেকেও কিংস ড্র করেছিল। যদি দিয়াবাতে পেনাল্টি মিস না করতেন তাহলে তো আবাহনীই জিতে যেত। সেজন্য ১ গোলে এগিয়ে থাকার পরও ম্যাচে কি ঘটে তা নিয়ে কিছুটা চিন্তা তো ছিল। সোহেল রানা সিনিয়র ডি-বক্সের বাইরে থেকে গোলরক্ষক মিতুলকে বাঁ পায়ের বাঁকানো শটে পরাস্ত করলে ষষ্ঠ শিরোপা নিশ্চিত হয় কিংসের। অবশ্য প্রথমার্ধে সোহেল আরেক বার জাল কাঁপিয়ে ছিলেন। কিন্তু অফ সাইডে তা বাতিল হয়। লিগের পর মঙ্গলবার ফেডারেশন কাপের ফাইনাল খেলবে কিংস। জিতলে স্বাধীনতার পর তারাই দ্বিতীয়বার এক মৌসুমে তিন শিরোপার কৃতিত্ব পাবে। ইতিহাস কোনোভাবেই পিছু ছাড়ছে না কিংসের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights