বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা ১০ কিংবদন্তি: কে সবার আগে পেলে, ম্যারাডোনা নাকি মেসি?

অনলাইন ডেস্ক

গত এক শতাব্দী ধরে অনুষ্ঠিত ২২টি টুর্নামেন্টের হাজারো ফুটবলারের মধ্য থেকে সেরা ১০ জন বিশ্বকাপ কিংবদন্তি বেছে নেওয়া যেকোনো ফুটবল বিশ্লেষকের জন্যই এক কঠিন পরীক্ষা। জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসা, ব্রাজিলের গারিঞ্চা, ইতালির রবার্তো বাজ্জো কিংবা এক টুর্নামেন্টে ১৩ গোল করা ফ্রান্সের জা ফন্টেইন; এমন অনেক নামই হয়তো এই সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা পায়নি। তবে ফুটবল ইতিহাসের পাতা উল্টে বিশ্বকাপ মঞ্চে নিজেদের অমর করে রাখা এমন ১০ জন মহাতারকাকে নিয়েই সাজানো হয়েছে এই প্রতিবেদন, যাঁরা ফুটবল মহোৎসবে সবচেয়ে বেশি দ্যুতি ছড়িয়েছেন।

তালিকার শুরুতেই বলতে হয় ইংল্যান্ডের স্যার জিওফ হার্স্টের কথা। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে চোট পাওয়া তারকা স্ট্রাইকার জিমি গ্রিভসের জায়গায় খেলতে নেমে ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে এক অবিশ্বাস্য হ্যাটট্রিক করেন তিনি। তার সেই কীর্তিতে ভর করেই একমাত্র বিশ্বকাপটি জিতেছিল ইংল্যান্ড। এরপরই আছেন ব্রাজিলের কাফু, যিনি ফুটবল ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে টানা তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার অনন্য নজির গড়েছেন। ১৯৯৪ ও ২০০২ সালের বিশ্বজয়ী এই রাইট-ব্যাক ছিলেন সেলেসাওদের রক্ষণ ও আক্রমণের মূল চালিকাশক্তি। ১৯৮২ সালের ইতালিকে বিশ্বকাপ জেতাতে পাওলো রসি যা করেছিলেন, তা ফুটবল ইতিহাসে রূপকথার মতো। ম্যাচ ফিক্সিংয়ের নিষেধাজ্ঞা থেকে ফিরে সেবার ব্রাজিল, পোল্যান্ড এবং ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতে নেন এই পেনাল্টি বক্সের রাজা।

ফরাসি ফুটবলের জাদুকর জিনেদিন জিদানও আছেন এই মহাতারকাদের কাতারে। ১৯৯৮ সালে ঘরের মাঠে ব্রাজিলকে ফাইনালে জোড়া গোল দিয়ে ট্রফি এনে দেওয়া এবং ফরাসি বহুত্ববাদী সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে ওঠা জিদান ২০০৬ সালের ফাইনালে লাল কার্ডের ট্র্যাজেডি সত্ত্বেও বিশ্বকাপের অন্যতম বড় বিজ্ঞাপন। অন্যদিকে, মাত্র ২৭ বছর বয়সেই নিজের নাম এই কিংবদন্তিদের তালিকায় জুড়ে দিয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ২০১৮ সালে কিশোর বয়সে পেলের পর ফাইনালে গোল করা এবং ২০২২ সালের ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করে তিনি প্রমাণ করেছেন, বিশ্বকাপের মঞ্চেই তাঁর সেরা রূপটি দেখা যায়। ফুটবলের সম্রাটদের ভিড়ে জার্মানির ‘কাইজার’ ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার এক অনন্য নাম। ১৯৭৪ সালে অধিনায়ক হিসেবে ক্রুইফের টোটাল ফুটবলকে রুখে দিয়ে বিশ্বকাপ জেতার পর, ১৯৯০ সালে কোচ হিসেবেও জার্মানিকে বিশ্বসেরা করেন এই ডেকোরাম ও রক্ষণভাগের মহাতারকা।

বর্তমান প্রজন্মের অন্যতম সেরা এবং অনেকের মতেই সর্বকালের সেরা লিওনেল মেসি নিজের পঞ্চম বিশ্বকাপে এসে বৃত্ত সম্পূর্ণ করেছেন। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে হারের ধাক্কা সামলে, নকআউট পর্বের প্রতিটি ম্যাচে গোল করে এবং ফাইনালে জোড়া গোল দিয়ে আর্জেন্টিনাকে ৩৬ বছর পর সোনালি ট্রফি এনে দেন এই ফুটবল জাদুকর। আর ব্রাজিলের রোনালদো নাজারিও হলেন এক চরম নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের গল্প। ১৯৯৮ সালের ফাইনালে রহস্যময় অসুস্থতার কারণে ট্রফি হাতছাড়া হলেও, ২০০২ সালে চোট কাটিয়ে ফিরে ৮ গোল করে ব্রাজিলকে পঞ্চম বিশ্বকাপ জেতান এই ফেনোমেনন।

তবে ফুটবল বিশ্বকাপের রোমাঞ্চ আর উন্মাদনা যার নামের সাথে সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে, তিনি দিয়াগো আরমান্দো ম্যারাডোনা। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং মাঝমাঠ থেকে একক নৈপুণ্যে করা ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়। সেই বিশ্বকাপে ৫ গোল ও ৫ অ্যাসিস্ট করে একাই আর্জেন্টিনাকে চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন এই ফুটবল রাজপুত্র।

আর সবার শীর্ষে যার নাম অবধারিতভাবেই চলে আসে, তিনি ফুটবলের রাজা পেলে। ফুটবল ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে তিনটি ভিন্ন দশকে তিনটি বিশ্বকাপ জয়ের অনন্য কীর্তি তাঁর। ১৯৫৮ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হয়ে হ্যাটট্রিক ও ফাইনালের জোড়া গোলে ব্রাজিলকে প্রথম ট্রফি এনে দেন। এরপর ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে পেলের সেই শৈল্পিক ও নান্দনিক ফুটবল ব্রাজিলকে সর্বকালের অন্যতম সেরা দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ফুটবল বিশ্বকাপ যতদিন থাকবে, পেলের এই শ্রেষ্ঠত্বও ততদিন অম্লান থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights