এআই দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্রকে কি চাপে ফেলছে চীন? সামনে এলো নতুন সমীকরণ

অনলাইন ডেস্ক

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা নতুন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে। চলতি বছরের শুরুতে চীনা প্রতিষ্ঠান ডিপসিকের উন্মুক্ত এআই মডেল বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুললেও, সম্প্রতি আরেক চীনা প্রতিষ্ঠান জেড.এআইয়ের নতুন মডেল প্রকাশের পর আগের মতো তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এটিই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বৈশ্বিক এআই প্রতিযোগিতার চিত্র বদলাতে শুরু করেছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডিপসিক তাদের উন্মুক্ত ‘আর-ওয়ান’ মডেল প্রকাশ করে। সে সময় দাবি করা হয়, এটি কর্মক্ষমতায় মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানীয় বৃহৎ ভাষা মডেলগুলোর সমকক্ষ। সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল, মডেলটি বিনামূল্যে ডাউনলোড করে ব্যবহার করা যেত। এর প্রভাব এতটাই ছিল যে মার্কিন প্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য থেকে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার কমে যায়। একই সঙ্গে সরকারি যন্ত্রে এ মডেলের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবও ওঠে।

এর পর গত মাসে জেড.এআই তাদের ‘জিএলএম-৫.২’ মডেল উন্মুক্ত করে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, বিশ্ব এখন মেনে নিতে শুরু করেছে যে এআই প্রযুক্তিতেও চীন দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের সমপর্যায়ে উঠে আসছে। বর্তমানে দুটি দেশই আরও উন্নত এআই মডেল, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চিপ এবং ডেটা সেন্টার নির্মাণে প্রতিযোগিতায় রয়েছে। এদিকে ওয়াশিংটন চীনের কাছে অত্যাধুনিক চিপ রপ্তানিতে বিধিনিষেধ জোরদার করেছে এবং কিছু ক্ষেত্রে উন্নত মার্কিন এআই মডেলে বিদেশিদের প্রবেশাধিকারও সীমিত করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই শুধু ওষুধ আবিষ্কার বা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নয়, সামরিক প্রযুক্তি ও জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রে ওপেনএআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে সরকারি বিনিয়োগের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

তবে এআই উন্নয়নে দুই দেশের কৌশলে বড় পার্থক্য রয়েছে। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত তাদের মডেল উন্মুক্ত করে দেয়, যাতে ব্যবহারকারীরা বিনামূল্যে নিজস্ব সার্ভারে চালাতে পারেন। বিপরীতে, অধিকাংশ মার্কিন প্রতিষ্ঠান নিজস্ব ক্লাউডভিত্তিক অবকাঠামোতে মডেল সংরক্ষণ করে অর্থের বিনিময়ে ব্যবহার সুবিধা দেয় এবং প্রযুক্তির ভেতরের কাঠামো গোপন রাখে।

যদিও চীনের উন্মুক্ত মডেলগুলো সব ক্ষেত্রে মার্কিন প্রিমিয়াম মডেলের সমমানের নয়, তবু সাধারণ ব্যবহারকারীদের অনেক প্রয়োজনই সেগুলো পূরণ করতে পারে। যুক্তরাজ্যের এক সফটওয়্যার ডেভেলপার নিউ সায়েন্টিস্টকে জানান, একই কাজ করতে জেড.এআইয়ের স্থানীয়ভাবে চালানো মডেলে প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি সময় লেগেছিল, তবে সেটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে।

এআই মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান আর্টিফিশিয়াল অ্যানালাইসিস জেড.এআইয়ের জিএলএম-৫.২-কে বর্তমানে সবচেয়ে বুদ্ধিমান উন্মুক্ত এআই মডেল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। জেড.এআইয়ের দাবি, সফটওয়্যার প্রকৌশলসংক্রান্ত একটি পরীক্ষায় তাদের মডেল ওপেনএআইয়ের জিপিটি-৫.৫-কে ছাড়িয়ে গেছে। তবে একই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব মূল্যায়নে জিপিটি-৫.৫ এখনো সামান্য এগিয়ে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি দেখিয়ে দেয় যে এআই কর্মক্ষমতা পরিমাপের জন্য এখনো বিশ্বব্যাপী কোনো একক মানদণ্ড গড়ে ওঠেনি।

ব্যবহারকারীদের মধ্যে জিএলএম-৫.২ দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। বৈশ্বিক এআই ব্যবহারের একটি অংশ পর্যবেক্ষণকারী প্ল্যাটফর্ম ওপেনরাউটার-এর তথ্যমতে, এটি বর্তমানে পঞ্চম সর্বাধিক ব্যবহৃত বৃহৎ ভাষা মডেল। তালিকার শীর্ষে রয়েছে ডিপসিকের সর্বশেষ সংস্করণ। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, শীর্ষ ১০টি মডেলের মধ্যে সাতটিই চীনা প্রতিষ্ঠানের।

বিশ্লেষকদের মতে, ডিপসিকের মতো বাজারে বড় ধাক্কা এবার না লাগার কারণ মানুষ ইতোমধ্যে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও রোবোটিক্সের মতো এআই প্রযুক্তিতেও চীন যে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে, তা এখন অনেকের কাছেই স্বাভাবিক বাস্তবতা।

ডেনমার্কের কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সার্জ বেলোনি বলেন, অতীতে সিলিকন ভ্যালি উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দিলেও চীন দ্রুত তা গ্রহণ করে উৎপাদন বাড়িয়েছে। তবে এবার তারা পরিকল্পিতভাবে এআই মডেল উন্মুক্ত করছে, যা পশ্চিমা ক্লোজড-মডেল প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সান ডিয়েগোর অধ্যাপক মিখাইল বেলকিনের মতে, চীনের ওপেন-সোর্স মডেলগুলো সক্ষমতায় যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক মাস আগের সেরা মডেলগুলোর কাছাকাছি এবং এগুলো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। তার ভাষ্য, মার্কিন ক্লাউডভিত্তিক মডেল যেকোনো সময় পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু উন্মুক্ত মডেল ব্যবহারকারীরা নিজেদের সার্ভারে দীর্ঘমেয়াদে চালাতে পারবেন।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের ডেভিড শ্রায়ারের মতে, ভবিষ্যতের এআই বাজারের আকার প্রায় ৬০ ট্রিলিয়ন পাউন্ড হতে পারে। তবে এর অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্বও রয়েছে। তিনি বলেন, সংবেদনশীল বিষয়ে চীনা ও মার্কিন এআই মডেলের উত্তর অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন হয়।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিলিপ টরের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি উন্নত এআই প্রযুক্তিতে আন্তর্জাতিক প্রবেশাধিকার আরও সীমিত করে, তাহলে শেষ পর্যন্ত সেটি চীনের পক্ষেই যেতে পারে। তিনি হুয়াওয়ের উদাহরণ টেনে বলেন, প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করা হলে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের বিকল্প প্রযুক্তি ও ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে বাধ্য হয়।

ডেভিড শ্রায়ার আরও দাবি করেন, পশ্চিমা মডেল বিশ্লেষণ করে চীন দ্রুত নিজেদের প্রযুক্তির সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। তার মতে, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত অগ্রগামিতা দীর্ঘদিন ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নীতি ও বিধিবিধান মেনে চলার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো এখনো এগিয়ে রয়েছে। ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করা উন্মুক্ত চীনা মডেল ব্যবহারে অনেক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ রয়েছে। এ কারণেই ইমেইল, অফিস সফটওয়্যার ও ক্লাউড সেবায় প্রতিষ্ঠিত মার্কিন কোম্পানিগুলো করপোরেট বাজারে এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে।

সার্জ বেলোনির মতে, মাইক্রোসফটের সাফল্যের অন্যতম কারণ শুধু প্রযুক্তি নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা ও নিয়ম মেনে চলার ক্ষেত্রে তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা।

অন্যদিকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিলিপ টর সতর্ক করে বলেছেন, ইউরোপ যদি নিজস্ব শক্তিশালী এআই অবকাঠামো গড়ে তুলতে না পারে, তাহলে ভবিষ্যতে তারা অন্য দেশের প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়বে। তার ভাষায়, এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—ইউরোপ নিজস্ব এআই সক্ষমতা তৈরি করবে, নাকি অন্যের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকবে।

তথ্যসূত্র : নিউ সায়েন্টিস্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights