রেফারিদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ কতোটা সত্য?

অনলাইন ডেস্ক

আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপের মেগা ফাইনালে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। লিওনেল মেসির সামনে যেমন রয়েছে আরেকটি সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরার সুযোগ, ঠিক তেমনি ফুটবল দুনিয়া বুঁদ হয়ে আছে মেসি বনাম লামিনে ইয়ামালের চরম দ্বৈরথ দেখার অপেক্ষায়। তবে মাঠের ফুটবলের পাশাপাশি মাঠের বাইরের আলোচনাও এখন তুঙ্গে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে ইন্টারনেটের বিভিন্ন প্রান্তে ফুটবল ভক্তদের বড় একটি অংশ দাবি করছেন, ফিফা নাকি নিজেই চায় আর্জেন্টিনা এবং লিওনেল মেসি বিশ্বকাপ জিতুক, আর এই ‘মাস্টারপ্ল্যান’ সফল করতে রেফারিরাও নাকি তাদের সাথে হাত মিলিয়েছেন।

তবে এই সমস্ত অভিযোগকে পুরোপুরি ‘বানোয়াট ও ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন ২০১০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের সহকারী রেফারি ড্যারেন ক্যান। নিজের সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, রেফারিদের জড়িয়ে এই ধরনের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়ানো সম্পূর্ণ অর্থহীন। ড্যারেন ক্যান জানান, ২০১০ ও ২০১৪ সালের দুটি বিশ্বকাপে রেফারি হাওয়ার্ড ওয়েবের দলের অংশ হিসেবে তিনি কাজ করেছেন। তারা সবসময় সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বর্তমান রেফারিং ব্যবস্থাতেও এর কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি বলে তিনি নিশ্চয়তা দেন।

তার মতে, বিশ্বকাপের রেফারিরা আসেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ও কনফেডারেশনের প্রতিনিধি, যাদের সেবা ফিফা মাত্র ছয় সপ্তাহের জন্য ধার করে। ফিফার নির্বাহী কমিটির সাথে রেফারিদের কোনো গোপন বৈঠক তো দূরের কথা, সাধারণ কোনো দেখা-সাক্ষাৎও হয় না। রেফারিরা একটি সম্পূর্ণ আলাদা ট্রেনিং ক্যাম্পে থাকেন, যেখানে প্রতিদিন কঠোর শারীরিক পরিশ্রম, ভিডিও ক্লিপ বিশ্লেষণ এবং গতদিনের ম্যাচের চুলচেরা বিশ্লেষণ করেই তাদের সময় কাটে। ফলে কোনো পূর্বনির্ধারিত ফলাফল এনে দেওয়ার জন্য কোনো মহলের পক্ষ থেকে রেফারিদের নির্দেশনা দেওয়ার দাবিটি একেবারেই অবান্তর।

মেসি এবং লামিনে ইয়ামালের ছোটবেলার একটি ছবিকে কেন্দ্র করে যে গুঞ্জন ছড়ানো হচ্ছে, তা নিয়েও কথা বলেন ক্যান। তিনি জানান, এই ধরনের ছবির ব্যাপারে টুর্নামেন্টের বেশিরভাগ রেফারির বিন্দুমাত্র ধারণাও নেই। মাঠে জার্সি দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, পিঠের নাম দেখে নয়। নিজের ক্যারিয়ারের এক স্মৃতি রোমন্থন করে তিনি বলেন, বার্সেলোনা ও বায়ার্ন মিউনিখের মধ্যকার এক চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ম্যাচে মেসি পেনাল্টি বক্সে পড়ে গেলেও তারা পেনাল্টি দেননি। পরে ভিডিও দেখে মনে হয়েছিল সেটি হয়তো পেনাল্টি ছিল কিন্তু ভুল হলেও সিদ্ধান্তটি ছিল সম্পূর্ণ সততার সাথে নেওয়া।

এবারের বিশ্বকাপে রেফারিদের পক্ষপাতিত্বের এই গুঞ্জন এতটাই মাথাচাড়া দিয়েছে যে, শেষ ষোলোর ম্যাচে আর্জেন্টিনার কাছে মিশরের ৩-২ ব্যবধানে হারের পর রেফারির সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় খোদ ফিফার রেফারি কমিটির প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনাকে মাঠে নামতে হয়েছিল। তিনি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেটেক্সিয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের স্বাধীনতা ও সততার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। ড্যারেন ক্যান সতর্ক করে বলেন, এই ধরনের ভিত্তিহীন গুজব রেফারি ও তাদের পরিবারের জন্য মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এবারের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের রেফারি মাইকেল অলিভার এবং অ্যান্থনি টেলরকেও অতীতে এমন হুমকির সম্মুখীন হতে হয়েছে।

এবারের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত হওয়া ১০৩টি ম্যাচের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এত বিশাল সংখ্যক ম্যাচে কিছু ভুলত্রুটি হওয়াটা স্বাভাবিক। জার্মানি, ইকুয়েডর, ঘানা কিংবা ব্রাজিলের ম্যাচেও কিছু ভুল সিদ্ধান্ত দেখা গেছে, যা প্রিমিয়ার লিগের সাধারণ ভুলত্রুটির মতোই। রবিবারের ফাইনালে রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন স্লোভেনিয়ার স্লাভকো ভিনসিক। ড্যারেন ক্যান নিশ্চিত করে বলেছেন, একজন রেফারির কাছে বিশ্বকাপ ফাইনাল পরিচালনা করা তার ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ চূড়া। সেখানে ভিনসিকের একমাত্র লক্ষ্য থাকবে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত ছাড়া ম্যাচটি শেষ করা, কে ট্রফি জিতল তা নিয়ে তার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা থাকবে না।

সূত্র: বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights