কানাডাকে জাতীয়তাবাদে উজ্জীবিত করে দিচ্ছেন ট্রাম্প!

অনলাইন ডেস্ক
দ্বিতীয় মেয়াদে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার আগে আমেরিকা-কানাডা সম্পর্কটি ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস এবং বন্ধুত্বের। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে ৮ হাজার ৮৯১ কিলোমিটারের বিশ্বের দীর্ঘতম আন্তর্জাতিক সীমান্ত বরাবরই সম্পূর্ণ অরক্ষিত বা সামরিকায়নমুক্ত। দুই দেশের নাগরিকরা অবাধে যাতায়াত করতে পারেন। মার্কিন নাগরিকরা কানাডাকে তাদের সবচেয়ে পছন্দের দেশগুলোর একটি মনে করতেন এবং সাধারণ কানাডিয়ানদের মধ্যেও আমেরিকার প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। এখনো অধিকাংশ আমেরিকান কানাডার প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। তবে কানাডায় এখন মার্কিনবিরোধী মনোভাব প্রবল। কানাডায় এখন দেশপ্রেমের জোয়ার বইছে। আর এর পেছনে একক দায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের।

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডাকে আমেরিকার ৫১তম অঙ্গরাজ্য বনে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। কানাবার সরকারি, বিরোধী দলসহ সর্বস্তরে এ প্রস্তাবের প্রবল প্রতিক্রিয়া হয়। এরপর ট্রাম্প আরও অনেক দেশের মতো কানাডাকেও শুল্ক আরোপ করে কাবু করতে চেয়েছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের প্রতিবাদে গতবছর মার্চে কানাডাও পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। একই সময়ে কানাডার প্রাদেশিক সরকারগুলো মার্কিন অ্যালকোহল আমদানির ওপর আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পরবর্তীতে কানাডা কিছু ক্ষেত্রে পাল্টা শুল্ক প্রত্যাহার করলেও বেশিরভাগ প্রদেশই মার্কিন মদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তোলেনি।

কানাডার ১৩টি প্রদেশ ও অঞ্চলের মধ্যে ১১টিতেই এই বয়কট ও নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকর রয়েছে। যার ফলে কানাডার দোকানগুলোর তাক থেকে আমেরিকান মদ ও ক্যালিফোর্নিয়ার ওয়াইন পুরোপুরি উধাও হয়ে যায়। এই বয়কটের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মদ উৎপাদনকারী শিল্প বিশাল লোকসানের মুখে পড়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কানাডায় মার্কিন অ্যালকোহল আমদানি প্রায় ৮১ শতাংশ কমে গেছে। এটি বর্তমানে দুই দেশের মধ্যকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা ছাড়াও কানাডার জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই মার্কিন অ্যালকোহল বর্জন করে। কানাডার জনগণের এই জাতীয়তাবাদী চেতনা আরও গতি পায় গত সপ্তাহে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে একটি নতুন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিল। কিন্তু কানাডার সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্নকারী কিছু শর্ত এবং শেষ মুহূর্তের অন্যায্য পরিবর্তনের কারণে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এই আলোচনা বাতিল ঘোষণা করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ট্রাম্প কানাডার পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। জবাবে কানাডাও মার্কিন পণ্যের ওপর ৫০ ভাগ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করে।

এমনিতেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের নানা অন্যায্য বক্তব্য ও আচরণে বিরক্ত ছিল কানাডার মানুষ। বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে কানাডার সরকারের অনমনীয় অবস্থান সাধারণ কানাডিয়ানদের মধ্যে তীব্র মার্কিন-বিরোধী ক্ষোভ ও অর্থনৈতিক দেশপ্রেম জাগ্রত করেছে। সাধারণ ভোক্তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই মার্কিন মদ, কফি কিংবা পণ্য কেনা বর্জন করে নিজস্ব কানাডিয়ান পণ্য বেছে নিতে শুরু করেছেন। কানাডার সরকারও জনগণকে আগের চেয়ে বেশি মার্কিন পণ্য বর্জনের জন্য উৎসাহিত করছে।

নতুন মার্কিন শুল্কের জবাবে কানাডার পদক্ষেপ ঘোষণা করার সময় গত মঙ্গলবার অর্থমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া-ফিলিপ শ্যাম্পেন জোর দিয়ে বলেন, ‘এটি মনে রাখা ভালো যে আমাদের সবার সবচেয়ে বড় ক্ষমতা হলো আমাদের নিজেদের ক্রয়ক্ষমতা। আমরা কানাডিয়ান পণ্য কেনার সিদ্ধান্ত নিতে পারি এবং আমাদের অবশ্যই কানাডিয়ান পণ্য বেছে নিতে হবে।’ শিল্পমন্ত্রী মেলানি জোলি যোগ করেন, ‘আপনি যখন একটি কানাডিয়ান পণ্য বেছে নেন, তখন আপনি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপই সৃষ্টি করছেন না, বরং কানাডায় কর্মসংস্থানও রক্ষা করছেন।’

মন্ট্রিলের একটি সুপারমার্কেটের ব্যবস্থাপক পিটার জিয়ানোপোলিস বুধবার বলেন, ওয়াশিংটনের সাথে বাণিজ্য আলোচনা বন্ধ করার বিষয়ে কানাডা সরকারের সিদ্ধান্তের পর থেকে তিনি ভোক্তাদের আচরণে ইতিমধ্যেই একটি পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘গ্রাহকরা জানতে চান পণ্যগুলো কোথা থেকে এসেছে এবং পণ্যগুলো বেশি ব্যয়বহুল হলেও সর্বদা কুইবেকের পণ্যগুলোকে প্রাধান্য দেন।’

গত বছর থেকে দোকানগুলোতে পণ্যের উৎস স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করার জন্য লেবেল এবং কানাডার পতাকার ম্যাপেল পাতার ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। অনেক খুচরা বিক্রেতা অর্থনৈতিক দেশপ্রেমের আহ্বান জানাচ্ছেন। মন্ট্রিলের একটি কানাডিয়ান টায়ার দোকানের কর্মচারীরা বুধবার একটি উদ্দীপনামূলক স্লোগান লেখা টি-শার্ট পরেছিলেন, ‘আমরা সবাই কানাডার জন্য খেলি।’

খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাইরেও এই বয়কট পর্যটনে প্রভাব ফেলছে। আইনজীবী শার্লট ডুমোনসো বলেন, ‘আমি আগামী কয়েক বছর যুক্তরাষ্ট্রে ছুটিতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ এবার কিছুটা বাড়লেও গতবছর যুক্তরাষ্ট্রে কানাডিয়ানদের ভ্রমণের সংখ্যা ২৫ শতাংশ কমে গিয়েছিল।

উদ্বিগ্ন কিছু মার্কিন সীমান্ত রাজ্যের পর্যটন ব্যবসায়ীরা কানাডিয়ানদের জন্য বিভিন্ন ছাড়ের ব্যবস্থা করে লাল গালিচা সংবর্ধনা দিচ্ছেন। নিউইয়র্ক রাজ্য বিশেষ করে তাদের ’নিউইয়র্ক লাভস কানাডা’ উদ্যোগ চালু করেছে, যার মাধ্যমে বছরের শেষ নাগাদ কানাডিয়ানদের জন্য ধারাবাহিক কিছু প্রচারণামূলক ছাড়ের অফার দেওয়া হচ্ছে। তবে এসব বিচ্ছিন্ন চেষ্টায় কাজ হবে বলে মনে হয় না। যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে সিদ্ধান্ত আসতে হবে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights