গাইবান্ধায় ফের অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব

গাইবান্ধা প্রতিনিধি:

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় আবারও অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। রোগাক্রান্ত গবাদিপশু গরু জবাই ও মাংস কাটাকাটির পর উপজেলা পাঁচজনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। এতে গরু খামারি ও পশু মালিকদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তবে আক্রান্তদের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, আক্রান্তদের লক্ষণ দেখে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ থাকার প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে রোগ প্রতিরোধে নিয়মিত ও কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

আক্রান্তরা হলেন উপজেলার কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নের দুলাল গ্রামের নবীর হোসেনের ছেলে জাহেদুল ইসলাম (৫০), আব্দুল কুদ্দুস মিয়ার ছেলে খায়রুল ইসলাম (৩৫), আজিজল হকের ছেলে আজগর আলী (৪৮), আজির উদ্দিনের ছেলে আবুল হোসেন (৫০) ও হাবিজার রহমানের ছেলে নাজমুল হক (৪০)।

আক্রান্ত জাহেদুল ইসলাম বলেন, এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। জীবানু আছে কি না আতঙ্ক কাজ করছে ভিতরে ভিতরে। অসুস্থ হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা ইউনিয়ন পরিষদের কোনো লোক খোঁজ নেননি। তবে পশু হাসপাতালের লোকজন এসেছিলেন, তারা গরু ছাগলগুলোকে ভ্যাকসিন দিচ্ছেন।

বেলকা ইউনিয়নের তরুণ উদ্যোক্তা ও খামারি জিয়াউর রহমান সরকার বলেন, এনথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেই শুধু প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তৎপরতা চোখে পড়ে। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেই তাদের আর খোঁজ থাকে না। নিয়মিত টিকাদান ও আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা যথাযথভাবে হচ্ছে না।

সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার কসাই নয়া মিয়া বলেন, ১৫ ইউনিয়ন ও পৌরসভা মিলে সপ্তাহে প্রায় ৩’শ গরু জবাই হয়। পৌরসভার গরুগুলো পরীক্ষা করে জবাই করা হয়। বাকী ১৫ ইউনিয়নের খবর জানি না। এ বিষয়ে প্রশাসনের তদারকি করা দরকার।

কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মনোয়ার আলম সরকার বলেন, বিষয়টি আমি চৌকিদারের মাধ্যমে জেনেছি। শুনলাম পশু হাসপাতালের লোকজন এসেছিলেন। তারাও আমাকে বলেননি। তিনি বলেন, সরকারি ভাবে কোনো মনিটরিং নেই। সে কারণে এ অবস্থা।

এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. কেএম. ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, গত মাসের ২৫ তারিখে অসুস্থ গরু জবাই করা হয়েছে, আমরা সংবাদ পেয়েছি ৩১ তারিখে। এরপরে ঘটনাস্থলে গিয়ে মাংস পাইনি। কারো ফ্রীজে আছে কি না সেটাও জানার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারা বলেছেন সবগুলো মাংস তারা খাওয়া শেষ করেছেন। বর্তমানে ওই এলাকায় গরু ছাগলের ভ্যাকসিন দেয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আতিয়ার রহমান সোহাগ বলেন, আহতদের লক্ষণ দেখে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তাদের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ থাকতে পারে। তবে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে আক্রান্তদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করানোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

তিনি বলেন, আক্রান্তরা কেউই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসেননি। আমরাই তাদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছি।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, পরীক্ষা ছাড়া কোনো গরু জবাই করার সুযোগ নেই। বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের। ভবিষ্যতে পরীক্ষা ছাড়া যেন কোনো গরু জবাই করা না হয়, সে বিষয়ে কসাইদের নিয়ে সভা করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।

এর আগে ২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর অ্যানথ্রাক্স রোগের উপসর্গ নিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের পশ্চিম বেলকা গ্রামের আবুল হোসেনের স্ত্রী রোজিনা বেগম (৪৫) নামের এক নারী।

জানা গেছে রোজিনা বেগমের তিনটি ছাগল ছিল। এর মধ্যে একটি ছোট ছাগল অসুস্থ হয়ে পড়ে। বেগতিক অবস্থা দেখে গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর সেটি জবাই করেন। এ সময় তার হাতের আঙুলে ক্ষত হয়। পরে স্থানীয় পল্লী চিকিৎসকের পরামর্শ নেন। এতে কাজ না হলে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও শেষে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

একই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর বেলকা ইউনিয়নের কিশামত সদর গ্রামের মাহবুবুর রহমানের একটি রোগাক্রান্ত গরু জবাই করা হয়। মাংস কাটাকাটির কাজে যুক্ত ছিলেন স্থানীয় ১১ জন। এর চারদিন পর ২ অক্টোবর তাদের সবার শরীরের বিভিন্ন অংশে ফোসকা দেখা দেয়। পচন ধরে মাংসে। বিশেষ করে হাত, নাক, মুখ ও চোখে এসব উপসর্গ দেখা দেয়। পরে তারা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হন। একই সময়ে সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডেও অসুস্থ গরুর জবাই ও মাংস কাটাকাটির সঙ্গে যুক্ত থাকায় ৬ জন আহত হয়েছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights