শিক্ষা ২০৫০ : মানুষ গড়ার এক নতুন দর্শন

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ মাহবুব হায়দার খান, এনডিসি পিএসসি (অব.)

পর্ব-৫

শিক্ষক ২০৫০-শিক্ষা বিপ্লবের প্রাণ

একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা পাঠ্যবইয়ের চেয়ে বড় হতে পারে, প্রযুক্তিতে অনেক দূর এগোতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে সেই শিক্ষাব্যবস্থার মান শিক্ষকের মানের চেয়ে ভালো হতে পারে না।

তাই শিক্ষা ২০৫০-এর স্বপ্ন শুরু করতে হবে শিক্ষককে দিয়ে। আমরা যদি ২০৫০ সালের জন্য সৃজনশীল, নৈতিক, যুক্তিবাদী, প্রযুক্তিসচেতন ও মানবিক একটি প্রজন্ম চাই, তাহলে প্রথমেই ভাবতে হবে-এই প্রজন্মকে গড়ে তুলবেন কারা? উত্তর একটিই-শিক্ষক। শিক্ষক আর শুধু পাঠদাতা নন। শতাব্দীর পর শতাব্দী শিক্ষক ছিলেন জ্ঞানের প্রধান উৎস।

শিক্ষক বলতেন, শিক্ষার্থী শুনত। শিক্ষক লিখতেন, শিক্ষার্থী মুখস্থ করত। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সেই সম্পর্ক দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একটি শিশু এখন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পৃথিবীর প্রায় যেকোনো বিষয়ে তথ্য পেতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাকে গণিত বুঝিয়ে দিতে পারে, ভাষা শেখাতে পারে, ইতিহাসের ঘটনা চোখের সামনে তুলে ধরতে পারে। এমনকি একজন শিক্ষার্থীর সক্ষমতা ও দুর্বলতা বুঝে তার জন্য আলাদা অনুশীলনের ব্যবস্থাও করতে পারে। তাহলে শিক্ষকের প্রয়োজন কি কমে যাবে? বরং উল্টোটা ঘটবে।

শিক্ষা ২০৫০

মানুষ গড়ার এক নতুন দর্শনকারণ তথ্য পাওয়া আর জ্ঞানী হওয়া এককথা নয়। কোন তথ্য বিশ্বাসযোগ্য, কোন প্রশ্ন করা জরুরি, পাওয়া জ্ঞান কিভাবে ব্যবহার করতে হবে এবং সেই জ্ঞান মানুষের কল্যাণে কাজে লাগবে কি না-এসব বোঝার জন্য প্রয়োজন বিবেচনাবোধ ও প্রজ্ঞা।
আর সেই বোধ তৈরি করার কাজটি শিক্ষকের। ২০৫০ সালের শিক্ষক তাই শুধু পড়াবেন না। তিনি হবেন শিক্ষার্থীর পরামর্শদাতা, সহযাত্রী, চরিত্র গঠনের কারিগর ও পথপ্রদর্শক।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষকের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়

শিক্ষা ২০৫০ এমন একটি শ্রেণিকক্ষের কথা বলে, যেখানে শিক্ষক ও প্রযুক্তি একে অপরের বিকল্প নয়, বরং পরস্পরের সহায়ক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পুনরাবৃত্তিমূলক পাঠদান, অনুশীলন, ভাষা শিক্ষা, মৌলিক ধারণা ব্যাখ্যা, শিক্ষার্থীর অগ্রগতি বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষাসামগ্রী তৈরিতে শিক্ষককে সহায়তা করতে পারে। কঠিন বিজ্ঞানকে চলমান দৃশ্যের মাধ্যমে, ইতিহাসকে কল্পিত বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে, ভাষাকে আনন্দময় অনুশীলনের মাধ্যমে এবং গণিতকে বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে শেখানো সম্ভব।

এতে শিক্ষকের সময় বাঁচবে। সেই সময় তিনি দিতে পারবেন এমন কাজে, যেখানে মানুষের বিকল্প এখনো নেই-শিক্ষার্থীর কৌতূহল জাগানো, তার ভয় ও সংকট বোঝা, সৃজনশীলতাকে উৎসাহ দেওয়া, দলবদ্ধভাবে কাজ করতে শেখানো, নৈতিক প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করা এবং ভালো মানুষ হওয়ার পথে তাকে উৎসাহিত করা। যন্ত্র একটি পাঠ বুঝিয়ে দিতে পারে। কিন্তু একজন মহান শিক্ষক একজন শিশুকে জীবনের পথ চিনতে সাহায্য করতে পারেন।

শিক্ষকের মর্যাদা ছাড়া শিক্ষার উৎকর্ষ সম্ভব নয়

আমরা প্রায়ই বলি, শিক্ষক জাতি গড়ার কারিগর। কিন্তু শুধু কথায় সম্মান জানিয়ে জাতি গড়ার কারিগর তৈরি করা যায় না। শিক্ষককে এমন আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা দিতে হবে, যাতে জীবিকা নির্বাহের চিন্তায় তাঁকে অতিরিক্ত কাজ বা অন্য পেশার ওপর নির্ভর করতে না হয়। মেধাবী তরুণদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ হতে হবে স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও যোগ্যতাভিত্তিক। একজন শিক্ষক যখন সমাজে সম্মানিত, প্রশিক্ষিত ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন পেশাজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবেন, তখন তাঁর শিক্ষার্থীরাও শিক্ষকতাকে সম্মানের পেশা হিসেবে দেখবে। শিক্ষকের মর্যাদা আসলে শিক্ষার মর্যাদারই প্রতিফলন।

প্রশিক্ষণ একবার নয়, সারা কর্মজীবন

২০৫০ সালের শিক্ষককে ২০২৬ সালের প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করা যাবে না। প্রযুক্তি, জ্ঞান ও কর্মজগৎ এত দ্রুত বদলে যাচ্ছে যে শিক্ষকদেরও নিয়মিত নতুন জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে হবে। প্রতিটি শিক্ষকের জন্য কর্মজীবনজুড়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কিভাবে শিশু শেখে, শিশুমনের বিকাশ কিভাবে ঘটে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিভাবে ব্যবহার করতে হয়, শিক্ষাসামগ্রী কিভাবে তৈরি করতে হয়, গবেষণা কিভাবে করতে হয়, যোগাযোগের দক্ষতা কিভাবে বাড়াতে হয় এবং শ্রেণিকক্ষে নেতৃত্ব কিভাবে দিতে হয়—এসব বিষয়ে শিক্ষকদের নিয়মিত শেখার সুযোগ থাকতে হবে। প্রশিক্ষণ যেন শুধু সনদ পাওয়ার আনুষ্ঠানিকতা না হয়। প্রশিক্ষণের ফলে শ্রেণিকক্ষে কী পরিবর্তন এসেছে, শিক্ষার্থীর শেখার অভিজ্ঞতা কতটা উন্নত হয়েছে—সেটিই হতে হবে প্রশিক্ষণের আসল মূল্যায়ন।

স্বাধীনতা যেমন প্রয়োজন, জবাবদিহিও তেমন

শিক্ষককে সৃজনশীল হওয়ার স্বাধীনতা দিতে হবে। প্রত্যেক শিক্ষককে একই বিষয় একইভাবে পড়াতে হবে-এমন যান্ত্রিক ব্যবস্থা সৃজনশীল শিক্ষা তৈরি করতে পারে না। একজন শিক্ষক স্থানীয় নদীকে উদাহরণ করে পরিবেশবিজ্ঞান শেখাতে পারেন। গ্রামের বাজার দিয়ে অর্থনীতির ধারণা বোঝাতে পারেন। পাশের কৃষিজমিকে কাজে লাগিয়ে জীববিজ্ঞান শেখাতে পারেন। স্থানীয় কোনো সমস্যা নিয়ে শিক্ষার্থীদের গবেষণা করতে দিতে পারেন। শিক্ষকের এই স্বাধীনতা শিক্ষাকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করবে। তবে স্বাধীনতার পাশাপাশি জবাবদিহিও থাকতে হবে। শিক্ষকের সাফল্য শুধু শিক্ষার্থীরা কত নম্বর পেল, তা দিয়ে মাপা উচিত নয়। শিক্ষার্থীরা কতটা প্রশ্ন করতে শিখেছে, যুক্তি দিয়ে ভাবতে শিখেছে, সমস্যা সমাধান করতে পারছে কি না এবং মানুষ হিসেবে কতটা বিকশিত হচ্ছে-এসবও দেখতে হবে।

প্রশাসনিক বোঝা থেকে শিক্ষককে মুক্ত করতে হবে

আমাদের অনেক শিক্ষককে পড়ানোর বাইরেও অসংখ্য কাগজপত্র, প্রতিবেদন, সভা ও প্রশাসনিক কাজ সামলাতে হয়। এতে শ্রেণিকক্ষে দেওয়ার মতো মূল্যবান সময় কমে যায়। ২০৫০ সালের শিক্ষককে তাই আবার শ্রেণিকেন্দ্রিক করতে হবে। প্রযুক্তির সহায়তায় উপস্থিতি, নিয়মিত প্রতিবেদন তৈরি, প্রাথমিক মূল্যায়নের হিসাব এবং অন্যান্য পুনরাবৃত্তিমূলক প্রশাসনিক কাজের বড় একটি অংশ স্বয়ংক্রিয় করা সম্ভব। শিক্ষকের সবচেয়ে মূল্যবান সময়টি যেন কাগজপত্রে নয়, শিশুর সঙ্গে কাটে—এটিই হওয়া উচিত লক্ষ্য।

গ্রামের শিক্ষক, শহরের শিক্ষক-মানের ব্যবধান কেন থাকবে? শিক্ষা ২০৫০-এর একটি মৌলিক অঙ্গীকার হতে হবে-কোনো শিশুর বসবাসের জায়গা তার শিক্ষার মান নির্ধারণ করবে না। প্রত্যন্ত গ্রামের একজন শিক্ষার্থীও যেন দক্ষ শিক্ষকের পাশাপাশি উন্নত শিক্ষাসামগ্রী, ভার্চুয়াল পরীক্ষাগার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় শেখার সুযোগ পায়। দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের পাঠ প্রযুক্তির মাধ্যমে দূরবর্তী বিদ্যালয়েও পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সেখানে স্থানীয় শিক্ষকই থাকবেন শিশুটির সবচেয়ে কাছের মানুষ, তার পরামর্শদাতা ও পথপ্রদর্শক। কারণ প্রযুক্তি দূরত্ব কমাতে পারে, কিন্তু মানুষের সম্পর্কের বিকল্প হতে পারে না।

শিক্ষককে আবার স্বপ্ন দেখাতে হবে

একজন ভালো শিক্ষক একটি শ্রেণিকক্ষ বদলে দিতে পারেন। একদল ভালো শিক্ষক একটি বিদ্যালয় বদলে দিতে পারেন। আর লক্ষাধিক দক্ষ, মর্যাদাবান ও নিবেদিত শিক্ষক একটি জাতির ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারেন। তাই শিক্ষা সংস্কারের প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়-নতুন বই কেমন হবে?

প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত-

আমাদের শিক্ষক কেমন হবেন?

২০৫০ সালের বাংলাদেশ যদি জ্ঞানভিত্তিক, মানবিক, উদ্ভাবনী ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হতে চায়, তাহলে আজকের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হতে হবে শিক্ষক তৈরিতে। কারণ বিদ্যালয়ের সবচেয়ে আধুনিক ভবন নয়, সবচেয়ে দামি কম্পিউটার নয়, এমনকি সবচেয়ে শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও নয়-একজন অনুপ্রাণিত শিক্ষকই একটি শিশুর জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী শিক্ষা-প্রযুক্তি।

আর সেই শিক্ষকই হতে পারেন শিক্ষা ২০৫০-এর স্বপ্নের বাংলাদেশের প্রকৃত নির্মাতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights