দেশে এসে বিয়ে ও কোরবানির ঈদ উদযাপন করতে চেয়েছিলেন শরিফুল
গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি
‘দেশে এসে পরিবারের সবার সঙ্গে আগামী কোরবানির ঈদ উদযাপন করার নিয়ত করেছিল শরিফুল। ভেবেছিলাম শরিফুল দেশে আসলে বিয়ে দেব, সেই জন্য ঘর সাজানো-গোছানোর অনেক কাজ করা হয়েছে। কিন্তু ওর কোরবানির ঈদ উদযাপন, আর বিয়ে করা হলো না। মৃত্যু যে এইভাবে হবে তা তো কখনো ভাবতেও পারিনি।’— কথাগুলো বলে ঘরে বসে বিলাপ করছিলেন প্রবাসে নিহত শ্রমিক শরিফুল ফকিরের (৩৫) মা নাসিমা বেগম (৫৫) ।
গতকাল সোমবার বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৮টায় মালয়েশিয়ায় মাটিচাপায় মারা যান তিনি। তার মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছানোর পর পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
নিহত শ্রমিক শরিফুল ফকিরের বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার বর্ণি ইউনিয়নের বর্ণি গ্রামে। তার বাবার নাম নজরুল ফকির। প্রায় চার বছর আগে পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে শ্রমিক হিসেবে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান।
তার ফুফু বিলকিস বেগম বলেন, শরিফুল মারা যাওয়ার আগের রাতেও ফোনে কথা বলেছে আমার সঙ্গে। বলেছে ফুফু কুরবানির ঈদে বাড়ি আসব, ভালো একটা ঘর করে বিয়ে করব। তোমরা মেয়ে দেখে রেখো। বলেছি তুই দেশে আয় তারপর তোরে নিয়ে মেয়ে দেখতে যাব। কিন্তু পরদিন সকাল ১০টায় শুনি আমাদের শরিফুল আর নেই। ছেলেটি খুব হাসিখুশি থাকত, সবাইকে খুব সম্মান করত।
ও আর আমাকে ফোন দিয়ে ফুফু বলে ডাকবে না বলেই কান্না শুরু করেন তিনি।
প্রতিবেশীরা জানান, বর্ণি ইউনিয়নের নজরুল ফকিরের ৪ সন্তানের মধ্যে সেজো ছেলে শরিফুল। মেজ ছেলে আশরাফুল ৭ বছর আগে মারা গেছেন। বড় ছেলে বেঁচে আছেন। আর ছোট ছেলে বাড়ির গরু-বাছুর দেখাশোনা করে। পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে প্রায় ৪ বছর আগে শ্রমিক হিসেবে মালয়েশিয়া যান শরিফুল। তারপর থেকে তার নিজস্ব খরচ বাদ দিয়ে বাড়িতে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পাঠাতেন। মাটি কাটার কাজ করার সময় সোমবার বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৮টায় মাটিচাপায় শরিফুল মারা যান। ওই খবর বাড়িতে পৌঁছানোর পর শরিফুলের পরিবারে চলছে শোকের মাতম।
শরিফুলের বাবা নজরুল ফকির বলেন, আমাদের পরিবারের মধ্যে শরিফুল একাই রোজগার করত। সেই টাকা দিয়েই আমাদের সংসার চলত। শুনেছি মালয়েশিয়ায় ড্রেন নির্মাণের জন্য মাটি কেটে দুই পাশে রাখা ছিল। তখন শরিফুল কাজের জন্য ড্রেনের মধ্য নামছে… এরপর মাটিচাপা পড়ে। তখন অন্য লোকেরা এসে শরিফুলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মারা যায়। আমার ছেলেকে একটু দ্রুত দেশে এনে দেন, শেষ বারের মতো ছেলেটাকে একটু দেখতে চাই।
শরিফুলের ছোট ভাই শিপুল ফকির বলেন, ভাইয়ার অনেক স্বপ্ন ছিল পরিবারের উন্নতি করবে, ঘরবাড়ি ঠিকঠাক করে বিয়ে করবেন। রবিবারও ফোনে কথা বলার সময় জানিয়েছে আগামী কোরবানির ঈদে বাড়ি আসবে, সবার সাথে ঈদ উদযাপন করবেন। তারপর বিয়ে করবে, সেজন্য আমাদের সবাইকে মেয়েও দেখতে বলেছে। কিন্তু বড় ভাইয়ের কোনো স্বপ্নপূরণের আগেই শেষ হয়ে গেল। আমার ভাইয়ের মুখটা একবার দেখতে চাই, সরকারের কাছে সেই দাবি আমাদের।
বর্ণি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ইঞ্জি. জাহাঙ্গীর কবির বলেন, ঘটনাটি জানার পর বাড়িতে গিয়ে আমরা তার পরিবারের লোকজনদের শান্ত্বনা দিয়েছি। সেই সাথে গোপালগঞ্জ-৩ আসনের (টুঙ্গিপাড়া-কোটালীপাড়া) এমপি এসএম জিলানীকে জানানো হয়েছে। তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন, যেভাবেই হোক নিহত শরিফুলের লাশটি যেন দ্রুত দেশে আনা যায়।
