ট্রাম্পের চাপ উপেক্ষা করে রাশিয়ার তেল স্থাপনায় হামলা ইউক্রেনের
অনলাইন ডেস্ক
রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপের মধ্যেই দেশটির সামারা অঞ্চলের একটি তেল স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি করেছে ইউক্রেন।
একই সময়ে রাশিয়ার একটি ড্রোন ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে পারমাণবিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের চত্বরে আঘাত হেনেছে। এতে আগুন লাগলেও সেখানকার গবেষণা চুল্লি বা নিরাপত্তাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বলে জানিয়েছে ইউক্রেনের পারমাণবিক নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার সামারা অঞ্চলের একটি তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, রাশিয়ার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা কমিয়ে দিতে ইউক্রেন দূরপাল্লার হামলা অব্যাহত রাখবে।
জেলেনস্কি এক বিবৃতিতে বলেন, “রাশিয়ার এই অসুস্থ যুদ্ধকে যেখানে থেকে এসেছে, সেখানেই ফিরিয়ে দিতে যারা কাজ করছেন, আমি তাদের প্রত্যেককে ধন্যবাদ জানাই।”
তিনি আরও জানান, ইউক্রেনের দূরপাল্লার হামলায় কৃষ্ণসাগরের একটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। এছাড়া রাশিয়ার ওরিওল অঞ্চলে হামলাকারী ড্রোন উৎক্ষেপণ ও সংরক্ষণের কাজে ব্যবহৃত একটি স্থাপনা এবং ব্রায়ানস্ক অঞ্চলে রুশ বাহিনীর একটি সরবরাহকেন্দ্রেও হামলা চালানো হয়েছে। সামারা অঞ্চলের তেল স্থাপনাটিও হামলার লক্ষ্য ছিল।
জেলেনস্কির ভাষায়, “এই মুহূর্তে আমাদের ঠিক এমন প্রতিক্রিয়াই প্রয়োজন। রাশিয়ার এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা আমরা ক্রমাগত কমিয়ে দেব।”
সামারা অঞ্চলে ইউক্রেনের এ ধরনের হামলা অবশ্য নতুন নয়। এর আগে ২১ ও ২২ সেপ্টেম্বর ইউক্রেনীয় বাহিনী সামারা ও উফার দুটি বড় তেল শোধনাগারে হামলা চালানোর কথা নিশ্চিত করেছিল ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফ। সামারার কুইবিশেভ তেল শোধনাগারটি ইউক্রেনের সীমান্ত থেকে প্রায় ৯১০ কিলোমিটার দূরে।
জ্বালানি অবকাঠামো ঘিরে পাল্টাপাল্টি হামলা
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি অবকাঠামো আবারও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে। ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও জ্বালানি স্থাপনায় দূরপাল্লার ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে। অন্যদিকে রাশিয়াও ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোয় বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে।
৩০ সেপ্টেম্বর রাশিয়া ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের হিসাবে, হামলার বড় অংশের লক্ষ্য ছিল কিয়েভ ও আশপাশের বিদ্যুৎ অবকাঠামো। এতে প্রাণহানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে।
ইউক্রেনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাশিয়ার ওই হামলা ছিল সাম্প্রতিক মাসগুলোর অন্যতম বড় সমন্বিত হামলা। বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হামলার ফলে কয়েকটি অঞ্চলে জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করতে হয়।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই রাশিয়ার ভেতরে তেল স্থাপনায় ইউক্রেনের নতুন হামলা যুদ্ধের জ্বালানি অবকাঠামোকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি আঘাতের মাত্রা আরও বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কিয়েভে পারমাণবিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানে রুশ ড্রোন
এদিকে ৩০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় কিয়েভের ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চের চত্বরে একটি রুশ ড্রোন আঘাত হানে। ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ১৮ মিনিটে ড্রোনটি ওই প্রতিষ্ঠানের এলাকায় আঘাত করে। সেখানে কিয়েভ রিসার্চ রিঅ্যাক্টর অবস্থিত।
ড্রোন আঘাতের পর সেখানে আগুন ধরে যায়। পরে দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তবে এতে কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে জানানো হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গবেষণা চুল্লিটি এবং এর নিরাপত্তাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। হামলার পর তেজস্ক্রিয়তার মাত্রাতেও কোনও পরিবর্তন দেখা যায়নি বলে পারমাণবিক নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে। হামলায় ঠিক কোন স্থানে ড্রোনটি আঘাত করেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি। ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন ও তদন্ত চলছে।
কিয়েভের এই গবেষণা চুল্লির ক্ষমতা প্রায় ১০ মেগাওয়াট। এটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত বাণিজ্যিক পারমাণবিক চুল্লির তুলনায় অনেক ছোট। তবে যুদ্ধের সময় পারমাণবিক গবেষণা স্থাপনার কাছাকাছি হামলা নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ইউক্রেনের পারমাণবিক স্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর ইউক্রেনের একাধিক পারমাণবিক স্থাপনা ও এর আশপাশের এলাকায় হামলা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, যা ২০২২ সালে রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
ইউক্রেনে মোট চারটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এসব স্থাপনার আশপাশে সামরিক কর্মকাণ্ড, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই পারমাণবিক দুর্ঘটনার আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছে বিভিন্ন পক্ষ।
কিয়েভের গবেষণা চুল্লিতে সর্বশেষ হামলায় কোনও পারমাণবিক ক্ষতি হয়নি এবং তেজস্ক্রিয়তার মাত্রাও স্বাভাবিক রয়েছে- এ তথ্য স্বস্তিদায়ক হলেও যুদ্ধের মধ্যে পারমাণবিক স্থাপনার আশপাশে হামলার ঝুঁকি যে বহাল রয়েছে, ঘটনাটি তা আবারও সামনে এনেছে।
এদিকে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে। ফলে একদিকে রাশিয়ার তেল স্থাপনাগুলো ইউক্রেনের দূরপাল্লার হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে, অন্যদিকে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় রুশ হামলা শীত মৌসুম সামনে রেখে নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
