দ্বিমুখিতা ঘৃণিত স্বভাব
শায়খ আহমাদুল্লাহ
মানব চরিত্রের কিছু স্বভাব অত্যন্ত নিন্দনীয়, যা থেকে মহান আল্লাহ আমাদের বিরত থাকতে বলেছেন। এর অন্যতম হলো দ্বিমুখিতা। সামনে একরকম, পেছনে আরেকরকম; একজনের কাছে এক কথা, অন্যজনের কাছে তার বিপরীত কথা বলা-এ ধরনের আচরণকারীকে দ্বিমুখী বলা হয়। আর একের কথা অন্যের কাছে লাগিয়ে সম্পর্ক নষ্ট করার চেষ্টা করাকে বলা হয় চোগলখুরি। নবীজি (সা.) বলেছেন, চোগলখোর কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না (মুসলিম)।
দ্বিমুখী মানুষ সাধারণত নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্য মানুষের মন বুঝে কথা বলে। যার সামনে যে কথা বলা প্রয়োজন, তার সামনে সে সেটিই বলে। এক পক্ষের কাছে অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে কথা বলে আবার অন্য পক্ষের কাছে গিয়ে নিজেকে তার আপনজন হিসেবে উপস্থাপন করে। বাইরে থেকে তার আচরণে মিশুকতা দেখা গেলেও ভিতরে থাকে হিসাবনিকাশ ও স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা।
রসুল (সা.) এমন মানুষদের কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন- ‘নিশ্চয়ই মানুষের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হলো দ্বিমুখী ব্যক্তি, যে এক দলের কাছে এক মুখ নিয়ে আসে এবং অন্য দলের কাছে অন্য মুখ নিয়ে আসে’ (মুসলিম)। দ্বিমুখী মানসিকতা, চোগলখুরি ও ছলচাতুরী সমাজজীবনকে বিষাক্ত করে তোলে। এতে মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট হয়। যে ব্যক্তি বাইরে একরকম এবং ভিতরে অন্যরকম, সে শুধু আল্লাহর কাছেই ঘৃণিত নয়; বরং মানুষ যখন তার এই স্বরূপ জেনে ফেলে, তখন তাদের কাছেও সে ঘৃণা ও অবিশ্বাসের পাত্রে পরিণত হয়।
অনেকে ক্ষেত্রবিশেষে দ্বিমুখী আচরণকে কৌশল মনে করেন। কিন্তু দ্বিমুখিতা আর কৌশলী আচরণ এক জিনিস নয়। পরিস্থিতি বুঝে কথা বলা, অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে বিরত থাকা কিংবা মানুষের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বক্তব্যে সংযম করা প্রজ্ঞার অংশ হতে পারে। কিন্তু সত্য গোপন করে, এক পক্ষকে অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে উসকে দিয়ে কিংবা প্রত্যেকের কাছে নিজেকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে স্বার্থ হাসিল করা দ্বিমুখিতা। এ ধরনের আচরণের ব্যাপারে রসুল (সা.) কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
মুমিন মুসলমানের চরিত্র কখনো এমন হতে পারে না। মুমিন ব্যক্তি সামনে যেমন, আড়ালেও তেমন হবে। কাউকে ভালোবাসলে তার সামনে যেমন ভালো কথা বলবে, তার অনুপস্থিতিতেও তার সম্মান রক্ষা করে চলবে। কারও কোনো ভুল থাকলে তা নিয়ে মানুষের মধ্যে ঘুরে বেড়ানোর পরিবর্তে তাকে সংশোধনের সুযোগ তৈরি করে দেবে। কারণ সে জানে, মানুষের কাছে নিজের ভাবমূর্তি রক্ষা করার চেয়ে আল্লাহর কাছে নিজের চরিত্র শুদ্ধ রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাই আমাদের প্রত্যেকের নিজের দিকে তাকানো দরকার যে, আমি এমন আচরণের মানুষ কি না! আমি কি এক ব্যক্তির কাছে অন্য ব্যক্তির এমন কথা বলি, যা তার কাছে পৌঁছলে সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে? আমি কি মানুষের মন পাওয়ার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের বক্তব্য বদলে ফেলি? কারও সামনে তার প্রশংসা করে পেছনে তার নিন্দা করি কি না? অন্যের কাছে নিজের অবস্থান শক্ত করার জন্য কি কখনো একজনের কথা আরেকজনের কাছে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করি? তাহলে আল্লাহর কাছে দ্রুত খাঁটি তওবা করে ফিরে আসা জরুরি। কারণ এটি সবচেয়ে ঘৃণিত মানুষের স্বভাব।
দ্বিমুখিতা থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো-সত্যবাদী হওয়া, অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে বিরত থাকা এবং মানুষের সন্তুষ্টির চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেওয়া। সব কথা সবাইকে বলতে হবে না; কিন্তু যা বলব, তা যেন মিথ্যা বা প্রতারণাপূর্ণ না হয়।
মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য অনেক কিছু করা যায়। কিন্তু প্রকৃত সম্মান অর্জিত হয় চরিত্রের স্বচ্ছতায়, ইমানের পরিপূর্ণতায়। আর যে মানুষ পরিস্থিতি ও ব্যক্তিভেদে নিজের মুখ বদলায়, যে যতই ভালো সাজার চেষ্টা করুক, সে ভালো নয়। একসময় তার কলুষ হৃদয় বেরিয়ে আসেই।
মানুষের আরেকটি নিন্দনীয় স্বভাব হলো অপ্রয়োজনে ঝগড়া-বিবাদ বা গন্ডগোল বাঁধানোর মানসিকতা। কিছু মানুষ স্বভাবগতভাবেই সংঘাতপ্রিয় হয়। রসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি হলো সে, যে অত্যন্ত ঝগড়াটে ও বিতণ্ডাপ্রবণ (বুখারি)।
এ ছাড়া অহংকার ও মিথ্যাচারও ঘৃণিত স্বভাব। আল্লাহ কোনো উদ্ধত ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না। যে ব্যক্তি নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে, অন্যদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে এবং অহংকারের বশে সত্যকে অস্বীকার করে, সে সমাজে ঘৃণার পাত্র হয়ে ওঠে। একইভাবে মিথ্যা বলা, আমানতের খিয়ানত করা এবং ওয়াদা ভঙ্গ করা মুনাফিকের লক্ষণ, যা মানুষকে নৈতিকভাবে ধ্বংস করে দেয়। সুতরাং প্রকৃত মুমিন মুসলমান হতে চাইলে এসব ঘৃণিত অভ্যাস পরিত্যাগ করা আবশ্যক।
জুমার মিম্বর থেকে
