দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা
রেজাবুদ্দৌলা চৌধুরী
রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকার গরিব ও নিম্নবিত্ত মানুষের স্বাস্থ্যসেবার প্রধান ভরসাস্থল ছিল রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। মানবসেবামূলক প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি গভীর রাতে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়। এর সঙ্গে জড়িত ছিল কায়েমি স্বার্থবাদীদের একটি গ্রুপ। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির জমি দখল ছিল তাদের উদ্দেশ্য। নেপথ্যে রাজনৈতিক মতলবও কাজ করেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করেছেন। পেছন থেকে যারা কলকাঠি ঘুরিয়েছেন তাদেরও আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা। যিনি একটি বিশেষ দলের কুকন হিসেবেও পরিচিত। একই দলের এক সংসদ সদস্যের ভাইয়ের নামও আলোচিত হচ্ছে রাড্ডাকাণ্ডে।
স্বাস্থ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। আইনশৃঙ্খলাও সভ্য সমাজের অনুষঙ্গ। যেকোনো সরকারের জনপ্রিয়তার অন্যতম সূচক আইনশৃঙ্খলা। মানুষ শুধু দুবেলা দুমুঠো ভাত খাওয়া নয়, রাতে নিরাপদে ঘুমানোর অধিকারও চায়। যে কারণে বলা হয় অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের চেয়ে নিরাপত্তার গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বিএনপি বরাবরই সংকল্পবদ্ধ ভূমিকা রেখেছে। দলটির জনপ্রিয়তার পেছনে এর অবদান অনস্বীকার্য। মানুষের শান্তিতে দিন যাপনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আপসহীন ভূমিকা গ্রহণ করেন। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে গঠন করেন র্যাব।
যারা সন্ত্রাস দমনে নজরকাড়া সাফল্য দেখায়। দেশের আইনশৃঙ্খলায় ইতিবাচক উন্নতি লক্ষ্য করা যায়। ছিনতাই-রাহাজানি বন্ধ হয় যেন আলাদিনের চেরাগের বদৌলতে। শহীদ জিয়া এবং বেগম খালেদা জিয়ার পথ ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গকারী যে-ই হোক, তাকে অপরাধী হিসেবে দেখার সংস্কৃতি চালু করেছেন। কারোর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে জবাবদিহির সম্মুখীন করছেন। দলের কেউ কোনো অপকর্মে জড়ালে তার প্রতি তিল ধরনের নমনীয়তা দেখানো হচ্ছে না। দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে কোনো আপস নয়, এমন বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে। রাড্ডাকাণ্ডে ইতোমধ্যে সংরক্ষিত আসনের একজন সংসদ সদস্য পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। এ অপকর্মে জড়িত অন্তত ৩০ জনকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। তাদের গ্রেপ্তারের সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও জবাব দিতে হবে। ইতোমধ্যে চাঁদাবাজি ও দখলবাজিতে জড়িত থাকার দায়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের বেশ কয়েকজন সদস্যকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে চলছে নানামুখী চেষ্টা। ক্ষমতাসীন দলের সৎ ও নিবেদিতপ্রাণ নেতা-কর্মীরা দুর্বিনীতদের দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তকে স্বস্তির চোখে দেখছেন। তাঁদের দাবি, আইনশৃৃঙ্খলা ভঙ্গ ও অপরাধের সঙ্গে যারা জড়িত তারা দল ও অঙ্গসংগঠনগুলোর ভাবমূর্তির জন্য বোঝাস্বরূপ। তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। আইনশৃঙ্খলার ওপর যেহেতু সরকারের জনপ্রিয়তা অনেকাংশে নির্ভরশীল, সেহেতু যারা হুমকি বলে বিবেচিত, তাদের শক্ত হাতে রুখতে হবে। সমাজবিরোধীদের সঙ্গে রাজনীতির দূরতম সম্পর্ক থাকা উচিত নয়। যারা রাজনীতির আড়ালে দুর্বৃত্তপনায় জড়িত, তাদের ঠেকাতে হবে যেকোনো মূল্যে। যারা ক্ষমতাসীন দলকে ফ্যাসিস্টদের অনুকরণে নিজেদের আখের গোছানোর পথ হিসেবে বেছে নিতে আগ্রহী, তাদের দুর্দিন ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এলোমেলো করে ‘দে মা লুটেপুটে খাই’ তত্ত্বেও গা ভাসালে, তাদের শুধু দল থেকে বহিষ্কারই যথেষ্ট নয়, আইনের আওতায় আনার দাবি বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনগুলোতেও জোরদার হয়ে উঠেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে প্রধানমন্ত্রীর জিরো টলারেন্স নীতি দুর্বিনীতদের জন্য হুঁশিয়ারি বলে বিবেচিত হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান জনমনে প্রভাব রেখেছে। ক্ষমতাসীন দলকে তা শুদ্ধাচারে উদ্বুদ্ধ করবে।
ইতিহাস বলে, জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব জনকল্যাণ নিশ্চিত করে। বিএনপি একটি গণসংগঠন। যে কেউ এ দলের সদস্য হওয়ার সুযোগ পায়। গণসংগঠনে মতলববাজদের অনুপ্রবেশ ঠেকানো সত্যিকার অর্থেই কঠিন। কিন্তু কেউ দলের আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে নিজের ভাগ্য গড়তে ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার বিকল্প নেই। প্রধানমন্ত্রী সে পথেই হাঁটার চেষ্টা করছেন। তাঁর পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মাতা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে অনুসরণ করে তিনি দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা প্রশংসার দাবিদার। বিশ্বের সব উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে এমন সংস্কৃতিই অনুসরণ করা হয়। জনগণ রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে সব সময় দায়িত্বশীল আচরণ আশা করে। অন্যায়কারী যে-ই হোক, তাকে ছাড় না দেওয়ার মনোভাব জনগণের প্রত্যাশাকে সম্মান জানানোর অনন্য প্রয়াস।
রাজনীতির লক্ষ্য জনকল্যাণ। স্বভাবতই রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের মধ্যে জনগণের জন্য ত্যাগ স্বীকারের মনোভাব থাকতে হবে। রাজনীতিতে নৈতিকতার গুরুত্ব অপরিসীম। এটিই নেতৃত্বের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য তাঁর পদকে কলঙ্কিত করেছেন রড্ডাকাণ্ডে জড়িত হয়ে। অথবা এ অপকর্মে জড়িতদের প্রশ্রয় দিয়ে। উন্নত দেশগুলোতে কেউ অনিয়ম বা অপরাধকাণ্ডে জড়িত হলে রাজনৈতিক দল তার দায় নেয় না। সেখানে অপরাধীকে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। উন্নত বিশ্বের দেশগুলো এই নীতি আমাদের দেশে চালু করা গেলে সুশাসন নিশ্চিত হবে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, বিশেষ করে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ ক্ষমতাসীন দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে।
আমরা জানি, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি জবাবদিহিতা। যারা চিকিৎসাকেন্দ্র বা কোনো জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানে হামলার ধৃষ্টতা দেখায়, তারা রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেওয়ার যোগ্যতা রাখে না। এটি একটি জঘন্য অপরাধ। এমন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠার পর প্রধানমন্ত্রী দলের একজন সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। স্বীকার করতেই হবে, দলের জন্যে পদত্যাগী সংসদ সদস্যের অবদান কম নয়। ফ্যাসিস্ট আমলে তাঁর পরিবারকে কঠিন অবস্থা মোকাবিলা করতে হয়েছে। তিনি তাঁর স্বামীকে হারিয়েছেন প্রতিপক্ষের দুর্বৃত্তদের হাতে। এ কারণেই তাঁকে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য করা হয়েছিল। কিন্তু আইনের শাসনের ক্ষেত্রে কোনো আপস করা চলে না। অতীত অবদান যা-ই থাকুক, রাড্ডাকাণ্ড তার সুনামে যে কলঙ্ক লাগিয়েছে দল তার দায় গ্রহণ করতে পারে না। এটি প্রমাণ করে অপরাধী যে-ই হোক পার পাবে না। রাড্ডাকাণ্ড দেশে শুদ্ধ রাজনীতির বিকাশ ঘটালে তা হবে এক বিরাট অর্জন। যাঁরা রাজনীতি করেন, তাঁদের বুঝতে হবে ক্ষমতা ভোগের বস্তু নয়। সেভাবে দেখলে নিজেদের সর্বনাশই ডেকে আনা হবে। রাজনৈতিক ক্ষমতা একটি পবিত্র দায়িত্ব ও আমানত। যখন কোনো জনপ্রতিনিধি এই আমানতের খেয়ানত করেন তখন তিনি জনগণের হৃদয় থেকে নিজের অবস্থান হারান।
এ ধরনের পদাধিকারীকে দলের নেতৃত্বে রাখা দলের ওপর ভারী বোঝ চাপানোর শামিল। প্রধানমন্ত্রী সতর্কভাবে সে পথ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। সংসদ সদস্য মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশদানের মাধ্যমে ক্ষমতার অহংকার ও অপব্যবহারের বিরুদ্ধেও দিয়েছেন কঠোর বার্তা।
♦ লেখক : বিএনপির সাবেক তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক
